কৃষি ও পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের আয়ের নতুন রাস্তা তৈরি করতে উত্তরপ্রদেশে গবাদি পশু-ভিত্তিক অর্থনীতিকে আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে গোমূত্র সংগ্রহ ও তা থেকে বিভিন্ন পণ্য তৈরির সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হল গরুর গোবর ও গোমূত্রকে শুধু বর্জ্য হিসেবে না দেখে সেগুলিকে অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা।
উত্তরপ্রদেশে গরু সংরক্ষণ এবং গবাদি পশু পালনকে ঘিরে বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ আগে থেকেই রয়েছে। রাজ্য সরকার গরু-ভিত্তিক পণ্য, জৈব কৃষি এবং পঞ্চগব্যভিত্তিক উৎপাদনকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে। ২০২৫ সালেও উত্তরপ্রদেশে গোমূত্র-ভিত্তিক পঞ্চগব্য পণ্য ও ফর্মুলেশন নিয়ে সরকারি উদ্যোগের খবর প্রকাশ্যে এসেছিল। সেই উদ্যোগে আয়ুষ বিভাগের সহায়তায় গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক যাচাইয়ের কথাও বলা হয়েছিল।
### গোমূত্র থেকেই তৈরি হতে পারে আয়ের পথ
সাধারণত গবাদি পশুর গোবরকে জৈব সার তৈরির কাজে ব্যবহার করা হলেও গোমূত্রের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে সীমিত। সরকারি পরিকল্পনার মাধ্যমে এই উপাদানকে সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরির সম্ভাবনা তৈরি করা হচ্ছে।
গোমূত্র থেকে জৈব কৃষির বিভিন্ন উপকরণ, কীটনাশক বা অন্যান্য গবাদি পশু-ভিত্তিক পণ্য তৈরির মডেল দেশের বিভিন্ন জায়গায় দেখা গিয়েছে। ফলে পশুপালকদের কাছ থেকে গোমূত্র সংগ্রহ করে তার বিনিময়ে অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি হলে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এর ফলে গরু পালন শুধুমাত্র দুধ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দুধের পাশাপাশি গোবর ও গোমূত্র থেকেও অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করার সম্ভাবনা থাকবে।
### উত্তরপ্রদেশে গরু-ভিত্তিক অর্থনীতিতে জোর
উত্তরপ্রদেশে গরু ও গবাদি পশুকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি রয়েছে। এর মধ্যে দুগ্ধ উৎপাদন বাড়ানো, পশুপালকদের সহায়তা, গরুর আশ্রয়স্থল তৈরি এবং দেশি গরুর সংরক্ষণ অন্যতম।
সরকারের বৃহত্তর লক্ষ্য হল গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলির আয় বাড়ানো। গোমূত্র ও গোবরকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা গেলে সেই লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রে নতুন একটি ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
২০২০ সালে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও গোবর ও গোমূত্র থেকে পণ্য তৈরি করে MSME খাতের মাধ্যমে বাজারজাত করার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। সেই সময় এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও উদ্যোগ তৈরির সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়েছিল।
### গোমূত্র সংগ্রহের মডেল কীভাবে কাজ করতে পারে?
এই ধরনের প্রকল্পে প্রথম ধাপে গরুর মালিক বা পশুপালকদের কাছ থেকে গোমূত্র সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র বা প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গিয়ে প্রক্রিয়াকরণ করা যেতে পারে।
প্রক্রিয়াকরণের পর তা থেকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক কৃষি ও জৈব চাষে ব্যবহারের উপযোগী তরল সার বা কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণকারী উপকরণ তৈরির মডেল ইতিমধ্যেই অন্য রাজ্যে দেখা গিয়েছে।
এই ধরনের ব্যবস্থার ফলে একদিকে পশুপালকরা সরাসরি অর্থ পেতে পারেন, অন্যদিকে স্থানীয় স্তরে প্রক্রিয়াকরণ ও উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি হলে কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে।
### কৃষকদের জন্য কী সুবিধা হতে পারে?
উত্তরপ্রদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির বড় অংশ কৃষি ও পশুপালনের উপর নির্ভরশীল। অনেক ছোট ও প্রান্তিক কৃষকের কাছে গবাদি পশু অতিরিক্ত আয়ের অন্যতম উৎস।
কিন্তু শুধুমাত্র দুধ বিক্রি করে সবসময় পর্যাপ্ত আয় করা সম্ভব হয় না। গোমূত্র ও গোবরের মতো উপজাতেরও যদি বাজারমূল্য তৈরি করা যায়, তাহলে পশুপালকদের মোট আয় বাড়তে পারে।
বিশেষ করে যাঁরা দেশি গরু পালন করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রকল্প অতিরিক্ত অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে। তবে বাস্তবে কতটা আয় হবে, তা নির্ভর করবে সংগ্রহমূল্য, স্থানীয় বাজার, উৎপাদন খরচ এবং প্রকল্পের পরিধির উপর।
### গোবরের পাশাপাশি গোমূত্রেও গুরুত্ব
গরুর গোবরের ব্যবহার ইতিমধ্যেই জৈব সার, বায়োগ্যাস এবং বিভিন্ন গ্রামীণ শিল্পে রয়েছে। গোমূত্রকেও একইভাবে অর্থনৈতিক কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা হচ্ছে।
দেশের অন্য রাজ্যে সরকারি পর্যায়ে গোমূত্র সংগ্রহের উদাহরণও রয়েছে। ছত্তীসগড়ের Godhan Nyay Yojana-র অধীনে গোমূত্র সংগ্রহ করে তা থেকে প্রাকৃতিক তরল সার ও কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণকারী পণ্য তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেখানে গোমূত্রের জন্য প্রতি লিটারে ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।
এই ধরনের মডেল উত্তরপ্রদেশের ক্ষেত্রেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
### কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা
গোমূত্র সংগ্রহের পাশাপাশি যদি স্থানীয় পর্যায়ে প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র তৈরি করা হয়, তাহলে একাধিক স্তরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সংগ্রহ, পরিবহণ, প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং এবং বাজারজাতকরণের সঙ্গে স্থানীয় মানুষ যুক্ত হতে পারেন। স্বনির্ভর গোষ্ঠী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং ছোট ব্যবসারাও এই ধরনের উদ্যোগে অংশ নিতে পারেন।
ফলে প্রকল্পটি শুধুমাত্র পশুপালকদের অতিরিক্ত আয় দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি বৃহত্তর গ্রামীণ অর্থনৈতিক মডেলে পরিণত হতে পারে।
### পঞ্চগব্য পণ্য নিয়েও উদ্যোগ
উত্তরপ্রদেশে গোমূত্রের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। ২০২৫ সালে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে পঞ্চগব্যভিত্তিক ফর্মুলেশন তৈরির কথা সামনে আসে। সেখানে গোমূত্র-ভিত্তিক প্রস্তুতি বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করার কথা জানানো হয়েছিল। পাশাপাশি সেগুলির কার্যকারিতা আধুনিক গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করার কথাও বলা হয়।
তবে কোনও গোমূত্র-ভিত্তিক পণ্যকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করার আগে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি উদ্যোগের লক্ষ্য এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত কার্যকারিতা—দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
### বাজার তৈরি করাই বড় চ্যালেঞ্জ
গোমূত্র সংগ্রহের ব্যবস্থা চালু করলেই প্রকল্প সফল হবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এর জন্য স্থায়ী বাজার তৈরি করা।
কোন পণ্য তৈরি হবে, তার মান কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, কোথায় বিক্রি হবে এবং ক্রেতাদের মধ্যে তার চাহিদা কতটা—এসব বিষয় নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে সংগ্রহ করা গোমূত্র কতদিন সংরক্ষণ করা যাবে এবং কীভাবে নিরাপদভাবে প্রক্রিয়াকরণ করা হবে, তাও গুরুত্বপূর্ণ।
যদি এসব ক্ষেত্রে সঠিক পরিকাঠামো তৈরি করা যায়, তাহলে গোমূত্র-ভিত্তিক শিল্প গ্রামীণ অর্থনীতির একটি ছোট কিন্তু সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
### পশুপালকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা
গ্রামের অনেক পরিবারে গরু পালন পারিবারিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু পশুর খাদ্য, চিকিৎসা এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচও কম নয়। তাই পশুর প্রতিটি উপজাত থেকে যদি কিছু আয় করা সম্ভব হয়, তাহলে পালনকারীদের আর্থিক চাপ কিছুটা কমতে পারে।
গোমূত্র বিক্রির সুযোগ সেই দিক থেকে একটি অতিরিক্ত আয়ের রাস্তা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ছোট পশুপালকদের জন্য নিয়মিত সংগ্রহ ও নির্দিষ্ট মূল্য নিশ্চিত করা গেলে এর প্রভাব আরও বেশি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, উত্তরপ্রদেশে গোমূত্রকে অর্থনৈতিকভাবে ব্যবহার করার উদ্যোগ গরু-ভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে। গোমূত্র সংগ্রহ করে তার বিনিময়ে অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে পশুপালকরা অতিরিক্ত আয় করতে পারবেন এবং প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণ ঘিরে স্থানীয় কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে জৈব কৃষি ও গরু-ভিত্তিক পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্পটির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সংগ্রহব্যবস্থা, মূল্য নির্ধারণ, পণ্যের মান, বৈজ্ঞানিক যাচাই, বাজার এবং প্রশাসনিক পরিকাঠামোর উপর। তাই এটিকে শুধু গোমূত্র বিক্রির প্রকল্প হিসেবে না দেখে বৃহত্তর গ্রামীণ অর্থনীতি ও পশুপালন-ভিত্তিক মূল্যশৃঙ্খলার অংশ হিসেবে দেখাই বেশি যুক্তিযুক্ত।


