পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার খড়গপুর ২ নং ব্লকের চাঙ্গুয়াল পঞ্চায়েত অফিসে গতকাল এমন এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে যা রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দুই নেত্রী—পঞ্চায়েত প্রধান দীপালি সিংহ এবং পঞ্চায়েত সদস্য সুজাতা দে—এর মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা ক্রমে রূপ নেয় শারীরিক সংঘর্ষে। সূত্রের খবর, ঘটনার সূত্রপাত হয় পঞ্চায়েতের কাজের বরাদ্দ ও গার্ডওয়াল প্রকল্প নিয়ে মতভেদের জেরে।
দু’জনেই একে অপরের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পঞ্চায়েত অফিসের ভেতরেই শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি, পরবর্তীতে জুতো দিয়ে আঘাতের চেষ্টা এবং মুখে কালি মাখানোর মতো কাণ্ড ঘটে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে আরও বড় অশান্তি ছড়াতে পারত।
দীপালি সিংহের দাবি, “আমাদের এক পঞ্চায়েত সদস্য আগেভাগেই কালি নিয়ে অফিসে আসে। আমার গায়ে ছিটানোর চেষ্টা করলে আমি তাঁকে ঠেলে সরিয়ে দিই। সেই সময় কিছুটা ধাক্কাধাক্কি হয়। এরপর কিছু লোকজন ঘটনাটি ভিডিও করে ভাইরাল করে দেয়।”
অন্যদিকে, সুজাতা দে’র অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর বক্তব্য, “পঞ্চায়েত প্রধান দীপালি সিংহই প্রথমে আমাকে মারধর করেন। মাটির টব দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করেন এবং মুখে ও জামায় কালি মাখিয়ে দেন। আমি ভয় পেয়ে অফিসে তালা দিয়ে সহকর্মীদের ডাকি। আমরা সবাই তৃণমূল কর্মী, কিন্তু এই আচরণ একেবারেই মানা যায় না।”
ঘটনার পরপরই খড়গপুর ২ নং ব্লকের জয়েন্ট বিডিও দীপঙ্কর রায় এবং খড়গপুর লোকাল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে দুই পক্ষেরই সমর্থকরা অফিসের বাইরে ভিড় জমায়, ফলে কিছুক্ষণ উত্তেজনা ছড়ায় এলাকাজুড়ে।
এই ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) তাঁর এক্স (Twitter) হ্যান্ডেলে ভিডিওটি শেয়ার করে কটাক্ষ করেন, “তৃণমূল এখন এমন জায়গায় পৌঁছে গেছে যেখানে নিজের দলের মহিলারাও নিরাপদ নয়। নাগরাকাটায় আদিবাসী সাংসদ খগেন মুর্মুকে রক্তাক্ত করার পর এবার নিজের দলের তপসিলি উপজাতি মহিলা পঞ্চায়েত প্রধানকেও অপমান করছে তারা।”
তিনি আরও লেখেন, “যারা মা-মাটি-মানুষের নামে ক্ষমতায় এসেছে, তারাই আজ বাংলার মাতৃশক্তিকে অপমান করছে। তৃণমূল কংগ্রেস এখন নিজেদের মধ্যেই সহিংসতা চালাচ্ছে। এটা স্পষ্ট প্রমাণ যে দলটি এখন ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে।”
শুভেন্দুর মন্তব্যের পর বিজেপি নেতৃত্বও ঘটনাকে হাতিয়ার করে রাজ্য সরকারের নারী নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার প্রশ্ন তোলে। অপরদিকে, স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব জানিয়েছে যে বিষয়টি দলের অভ্যন্তরীণ সমঝোতার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা চলছে এবং কোনো ‘রাজনৈতিক রঙ’ দেওয়া ঠিক নয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে খড়গপুর থানার পুলিশ। দুই নেত্রীর বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে এবং ভিডিও ফুটেজও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ব্লক প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, সরকারি দপ্তরে এমন আচরণ শোভন নয়, এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি থাকবে।
রাজ্য রাজনীতিতে এই ঘটনাকে ঘিরে যে ঝড় উঠেছে, তা থামার নাম নিচ্ছে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পঞ্চায়েত স্তর থেকে শুরু করে দলের উপরের স্তর পর্যন্ত এখন তৃণমূলের অন্তর্কলহ ক্রমেই প্রকাশ্যে চলে আসছে।




