জম্মু-কাশ্মীরের বিভিন্ন কলেজ ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরি থেকে হাজার হাজার বই সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ‘আপত্তিকর’ এবং ‘দেশবিরোধী’ বিষয়বস্তু রয়েছে—এই অভিযোগে লাইব্রেরির বই পরীক্ষা করে একাধিক বই circulation বা পাঠকদের ব্যবহারের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বিধানসভা অধিবেশনে এই সংক্রান্ত তথ্য সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বইগুলির বিষয়বস্তু যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হলেও, বিরোধী পক্ষের একাংশ এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, নির্দিষ্ট মানদণ্ড এবং কোন বই বা কোন লেখকের লেখা সরানো হয়েছে—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে জম্মু-কাশ্মীরের উচ্চশিক্ষা দপ্তরের অধীন বিভিন্ন লাইব্রেরিতে থাকা বিপুল সংখ্যক বই পরীক্ষা করা হয়েছে। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় **২১.৮১ লক্ষ বই** স্ক্রিনিং বা পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়। সেই পরীক্ষার পর ৪,২৪৯টি বই circulation থেকে প্রত্যাহার করার কথা বিধানসভায় জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, ইকোনমিক টাইমসের রিপোর্টে প্রত্যাহার করা বইয়ের সংখ্যা **৬,৫১৯** বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিভিন্ন সরকারি জবাব ও সংবাদ প্রতিবেদনে সংখ্যার পার্থক্য রয়েছে। ফলে চূড়ান্ত সংখ্যা এবং কোন কোন বই এই তালিকায় রয়েছে, তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই বিপুল বই পর্যালোচনার পেছনে মূল যুক্তি হিসেবে ‘আপত্তিকর’, ‘দেশবিরোধী’ বা বিচ্ছিন্নতাবাদী বিষয়বস্তুর কথা সামনে এসেছে। সরকারের বক্তব্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি লাইব্রেরিতে এমন কোনও সাহিত্য থাকা উচিত নয়, যা পড়ুয়াদের মধ্যে বিভাজনমূলক বা বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এমন বিষয়বস্তু তরুণদের মানসিকতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে।
তবে ‘আপত্তিকর’ বা ‘দেশবিরোধী’ বলতে ঠিক কী ধরনের বিষয়বস্তুকে বোঝানো হচ্ছে, সেটিই এখন অন্যতম বড় প্রশ্ন। কোনও বইয়ের নির্দিষ্ট অধ্যায়, কোনও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক মতামত, নাকি সরাসরি হিংসা বা বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রচার—কোন মানদণ্ডে বইগুলি চিহ্নিত করা হয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। এই কারণেই বই প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে ঘিরে স্বচ্ছতার দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।
জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভায় এই বিষয়টি উত্থাপন করেন আওয়ামি ইত্তেহাদ পার্টির লাংগেটের বিধায়ক শেখ খুরশিদ। তাঁর প্রশ্ন ছিল, এত বিপুল সংখ্যক বই সরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কী মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে এবং সেই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছেন। তিনি প্রত্যাহার করা বইগুলির **নাম, লেখক এবং প্রকাশকের তথ্য** প্রকাশের দাবিও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শুধুমাত্র ‘আপত্তিকর’ বা ‘দেশবিরোধী’ বলে উল্লেখ করলেই হবে না; কোন বই কেন সরানো হয়েছে, তার স্পষ্ট কারণও জানানো প্রয়োজন।
এই প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বাড়ছে কারণ লাইব্রেরির বই শুধুমাত্র বিনোদনের উপকরণ নয়। বিশেষ করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সাহিত্য, দর্শন এবং সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে বিভিন্ন মতাদর্শের বই থাকে। কোনও নির্দিষ্ট মতের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও সেই বই পড়ে গবেষণা করা বা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার সুযোগ শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনও বই প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও নিরপেক্ষ মানদণ্ড থাকা জরুরি বলে মনে করছেন শিক্ষামহলের একাংশ।
অন্যদিকে সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। জম্মু-কাশ্মীর দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। প্রশাসনের আশঙ্কা, কোনও কোনও ধরনের সাহিত্য বা প্রচারমূলক লেখা তরুণদের মধ্যে চরমপন্থী চিন্তা বা বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবকে প্রভাবিত করতে পারে। সেই কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরির বইও নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার দৃষ্টিকোণ থেকে পরীক্ষা করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে, এই ধরনের বই পরীক্ষা করার প্রক্রিয়াটি কীভাবে পরিচালিত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ বইয়ের বিষয়বস্তু যাচাই করতে হলে বিশেষজ্ঞদের একটি দল প্রয়োজন। ইতিহাস বা রাজনীতির কোনও বইয়ে বিতর্কিত বক্তব্য রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে বিষয়বিশেষজ্ঞদের মতামত গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র কোনও একটি শব্দ বা বাক্য দেখে বইকে ‘দেশবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করলে তার সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এই কারণে বই প্রত্যাহারের আগে বিশেষজ্ঞ কমিটির মতামত নেওয়া হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। যদি কোনও বইয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী বক্তব্য থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কোনও গবেষণামূলক বইয়ে একটি বিতর্কিত ঐতিহাসিক মতামত থাকলেই সেটিকে সরিয়ে দেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন মতামত সম্পর্কে জানার সুযোগ কমে যেতে পারে। ফলে নিরাপত্তা ও শিক্ষার স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বই প্রত্যাহারের ঘটনা কাশ্মীর অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে বেশি হয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, প্রত্যাহার করা বইয়ের প্রায় **৯৪ শতাংশই কাশ্মীর অঞ্চলের** প্রতিষ্ঠান থেকে সরানো হয়েছে। এই তথ্য সামনে আসার পর বিষয়টি আরও রাজনৈতিক তাৎপর্য পেয়েছে। কেন কাশ্মীর অঞ্চলের লাইব্রেরিগুলিতেই এত বেশি বইকে পর্যালোচনা বা প্রত্যাহারের আওতায় আনা হল, সেই প্রশ্নও উঠছে।
তবে এই বইগুলি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, নাকি শুধুমাত্র সরকারি লাইব্রেরির circulation থেকে সরানো হয়েছে—এই দুই বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। লাইব্রেরি থেকে বই সরানো মানেই বাজারে বইটির বিক্রি বা ব্যক্তিগত মালিকানায় বই রাখা নিষিদ্ধ হয়ে যায় না। তাই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার সময় ‘লাইব্রেরি থেকে প্রত্যাহার’ এবং ‘দেশজুড়ে বই নিষিদ্ধ’—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
সরকারি লাইব্রেরি থেকে কোনও বই প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রশাসনের দায়িত্বও বড়। একটি বই যদি সত্যিই হিংসা, সন্ত্রাস বা বিচ্ছিন্নতাবাদকে উৎসাহিত করে, তাহলে সেটি সরানোর যৌক্তিকতা থাকতে পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত যেন রাজনৈতিক মতামত দমন করার হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভিন্ন মতামত, সমালোচনা এবং বিতর্কের জায়গা থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
জম্মু-কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। ২০১৯ সালের পর থেকে অঞ্চলের প্রশাসনিক কাঠামো এবং নিরাপত্তা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ দমন এবং স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের সাহিত্য রাখা হবে, তা নিয়ে প্রশাসনের নজরদারি বাড়লেও তার সঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে মতের বহুমাত্রিকতা বজায় রাখার প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে।
বই প্রত্যাহারের এই ঘটনা তাই শুধুমাত্র লাইব্রেরির প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে বিষয়টির পুরো গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে শিক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক স্বচ্ছতার মতো একাধিক বিষয় জড়িয়ে রয়েছে। প্রশাসনের যুক্তি এবং বিরোধীদের প্রশ্ন—দুই দিকই এই বিতর্কের অংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট লিখিত নীতি থাকা প্রয়োজন। কোনও বইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে প্রথমে তার বিষয়বস্তু পরীক্ষা, তারপর বিশেষজ্ঞ মতামত, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ব্যাখ্যার সুযোগ এবং শেষে সিদ্ধান্ত—এই ধরনের একটি বহুস্তরীয় প্রক্রিয়া থাকলে বিতর্ক কমতে পারে। একই সঙ্গে প্রত্যাহার করা বইয়ের তালিকাও প্রকাশ করা হলে সাধারণ মানুষ জানতে পারবেন ঠিক কোন বই কেন সরানো হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে বিধানসভায় বইয়ের নাম, লেখক এবং প্রকাশকের তথ্য প্রকাশের দাবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ তথ্য প্রকাশ না হলে গুজব ও রাজনৈতিক জল্পনা বাড়তে পারে। একটি বই কেন সরানো হয়েছে তা স্পষ্টভাবে জানালে সরকারের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়েও জনসমক্ষে আলোচনা সম্ভব হবে।
আরও একটি বিষয় হল, লাইব্রেরি থেকে বই সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বিকল্প শিক্ষাসামগ্রী কীভাবে দেওয়া হবে। কোনও বই যদি নিরাপত্তাজনিত কারণে circulation থেকে বাদ দেওয়া হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে নির্ভরযোগ্য এবং গবেষণাভিত্তিক অন্য বই শিক্ষার্থীদের জন্য রাখা দরকার। কারণ কোনও একটি বই সরিয়ে দেওয়া হলেও সেই বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না।
বর্তমান বিতর্কের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সংখ্যার বিষয়টিও। একাধিক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ৪,২৪৯ এবং ৬,৫১৯—দুই ধরনের সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। তাই প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও একক তালিকা প্রকাশ করা হলে বিভ্রান্তি দূর হতে পারে। একই সঙ্গে কতগুলি বই পরীক্ষা করা হয়েছে, কতগুলি বই আপত্তিকর বলে চিহ্নিত হয়েছে এবং কতগুলি বই কেবল সাময়িকভাবে circulation থেকে সরানো হয়েছে—এই তথ্য আলাদা করে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, জম্মু-কাশ্মীরের কলেজ ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরি থেকে হাজার হাজার বই সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ইতিমধ্যেই বড় বিতর্ক তৈরি করেছে। প্রশাসনের যুক্তি, আপত্তিকর বা দেশবিরোধী বিষয়বস্তু যাতে শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত না করে, তার জন্য এই যাচাই জরুরি। অন্যদিকে, বিধায়কদের একাংশের প্রশ্ন—কোন বই সরানো হল, কেন সরানো হল এবং কে সেই সিদ্ধান্ত নিল, তা স্পষ্ট করা হোক। লক্ষ লক্ষ বই পরীক্ষা করার পর যে বিপুল সংখ্যক বই circulation থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেই সিদ্ধান্তের পূর্ণ স্বচ্ছতা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনে প্রত্যাহার করা বইগুলির তালিকা, মূল্যায়নের মানদণ্ড এবং বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হলে এই বিতর্কের প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।


