অসমে চলতি বর্ষার বন্যা পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং একাধিক নদীর জলস্তর বিপদসীমার উপরে উঠে যাওয়ায় রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। যদিও কিছু জায়গায় জল নামতে শুরু করেছে, তবুও হাজার হাজার পরিবার এখনও চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বহু মানুষ ঘরছাড়া হয়ে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাড়িঘর, কৃষিজমি, রাস্তা ও বিদ্যুৎ পরিকাঠামো।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে **দুই লক্ষেরও বেশি মানুষ** এখনও বন্যার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বিভিন্ন জেলায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে প্রশাসন, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF), রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (SDRF) এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি। নিরাপদ স্থানে মানুষকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল, ওষুধ এবং অন্যান্য জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্রহ্মপুত্র এবং তার উপনদীগুলির তীরবর্তী অঞ্চল। নদীর বাঁধ ভেঙে বা উপচে জল ঢুকে বহু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোথাও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গোটা গ্রাম জলের তলায় চলে যাওয়ার খবর মিলেছে। বন্যার জেরে বহু পরিবার তাদের সমস্ত সম্পত্তি হারিয়েছে এবং কৃষকদের ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
প্রশাসনের কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ, পানীয় জল এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বন্যার ১১ দিন পরও প্রায় **১৩ হাজার বিদ্যুৎ সংযোগ** পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বিদ্যুৎ দপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত পরিষেবা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে।
এদিকে ভারতের আবহাওয়া দপ্তর (IMD) অসমের একাধিক জেলায় আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। ফলে যেসব এলাকায় ইতিমধ্যেই নদীর জলস্তর বেশি, সেখানে নতুন করে জল বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিচু এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে এবং প্রয়োজনে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বন্যার প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষিজমি, গ্রামীণ রাস্তা, সেতু এবং অন্যান্য পরিকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বহু স্কুল ও সরকারি ভবন অস্থায়ী ত্রাণ শিবিরে পরিণত হয়েছে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থাও সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব করতে আরও সময় লাগবে।
অসম সরকার জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের একটি আন্তঃমন্ত্রক প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলি পরিদর্শন করে পরিস্থিতির মূল্যায়ন করেছে। এই সমীক্ষার ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় সহায়তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অসমে প্রায় প্রতি বছরই বর্ষার সময় বন্যা দেখা যায়। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং নদীভাঙনের কারণে এই সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম আবহাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে, যার প্রভাব বন্যার তীব্রতার উপর পড়ছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
সব মিলিয়ে, **অসমে বন্যা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে গেলেও এখনও লক্ষাধিক মানুষ তার প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নন।** প্রশাসন উদ্ধার ও পুনর্বাসনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, তবে নতুন করে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে।


