পশ্চিমবঙ্গে শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিনিয়োগ টানার উদ্যোগ আরও জোরদার করল রাজ্য সরকার। সেই লক্ষ্যেই মুম্বইয়ে গিয়ে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানির সঙ্গে বৈঠক করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার মুম্বইয়ে আম্বানির বাসভবন ‘অ্যান্টিলিয়া’-য় এই বৈঠক হয়। সেখানে রিলায়েন্স কর্তা মুকেশ আম্বানি এবং তাঁর ছেলে অনন্ত আম্বানি মুখ্যমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। দীর্ঘ সময় ধরে দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয় বলে জানা গিয়েছে। বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের সম্ভাবনা, নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান তৈরির মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী নিজেই সমাজমাধ্যমে এই বৈঠকের কথা জানিয়েছেন। ‘অ্যান্টিলিয়া’-য় আম্বানি পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তের ছবিও নিজের এক্স হ্যান্ডলে প্রকাশ করেছেন তিনি। পোস্টে শুভেন্দু অধিকারী জানান, পশ্চিমবঙ্গের শিল্পক্ষেত্রে অগ্রগতি ও সম্ভাবনা নিয়ে মুকেশ আম্বানির সঙ্গে তাঁর বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে। রাজ্যের যুব সমাজের দক্ষতা এবং শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব বলে আম্বানিকে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। শিল্পপতিরা পশ্চিমবঙ্গে এগিয়ে এলে রাজ্য সরকার তাঁদের স্বাগত জানাবে বলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন।
এই বৈঠকের তাৎপর্য রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক—দুই দিক থেকেই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। পশ্চিমবঙ্গে নতুন শিল্প স্থাপন এবং বড় বিনিয়োগ আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী একাধিকবার জানিয়েছেন, রাজ্যের শিল্পক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করাই তাঁর সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্সের সঙ্গে যোগাযোগ আরও দৃঢ় করার চেষ্টা শুরু হয়েছে।
মুকেশ আম্বানির সঙ্গে এই বৈঠকের আগে থেকেই রিলায়েন্সের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছিল। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, তিনি মুম্বই গিয়ে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করবেন এবং রাজ্যে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবেন। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী সোমবার মুম্বই সফর করেন তিনি। বৈঠকের পর সেই আলোচনাই এবার বাস্তব রূপ পেল।
রিলায়েন্সের মতো একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী যদি পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে বিনিয়োগ বাড়ায়, তাহলে তার প্রভাব একাধিক ক্ষেত্রে পড়তে পারে। শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি প্রযুক্তি, পরিষেবা, পরিকাঠামো এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। রিলায়েন্স ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন রাজ্যে একাধিক ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে কাজ করছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গেও তাদের উপস্থিতি বাড়লে রাজ্যের অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বৈঠকের পর এখনও কোনও নির্দিষ্ট বিনিয়োগের অঙ্ক বা চূড়ান্ত প্রকল্পের ঘোষণা হয়নি। তাই সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে আশাবাদ তৈরি হলেও তা বাস্তবায়নের জন্য পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা প্রয়োজন।
এর আগে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে রিলায়েন্সের সম্ভাব্য বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, বায়োগ্যাস এবং অন্যান্য শিল্পক্ষেত্রের কথা আলোচনায় এসেছে। সেমিকন্ডাক্টর এবং প্রযুক্তি শিল্প বর্তমানে ভারতের শিল্পনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ যদি এই ধরনের নতুন প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প আকর্ষণ করতে পারে, তাহলে রাজ্যের শিল্প কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষ কর্মীদের জন্যও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে অবশ্য শুধু বিনিয়োগ নয়, কর্মসংস্থানও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, রাজ্যের যুবসমাজের দক্ষতা ও শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলি রাজ্যে বিনিয়োগ করলে সরাসরি চাকরির পাশাপাশি পরোক্ষ কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে। ছোট ও মাঝারি শিল্প, সরবরাহকারী সংস্থা, পরিবহণ, পরিষেবা এবং স্থানীয় ব্যবসাগুলিও বড় শিল্প প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে লাভবান হতে পারে।
বৈঠকের আর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল ‘বনতারা’। গুজরাটের পর পশ্চিমবঙ্গেও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং চিকিৎসার জন্য ‘বনতারা’-র একটি শাখা তৈরি করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত এই উদ্যোগ বন্যপ্রাণীদের উদ্ধার, চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে কাজ করে। পশ্চিমবঙ্গে এমন একটি কেন্দ্র তৈরি হলে রাজ্যের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগের গুরুত্ব আলাদা। রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় জঙ্গল ও বন্যপ্রাণীর বাসস্থান রয়েছে। উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স থেকে শুরু করে দক্ষিণবঙ্গের সুন্দরবন—বিভিন্ন অঞ্চলে হাতি, গন্ডার, বাঘসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির প্রাণীর বাস। আহত বা অসুস্থ বন্যপ্রাণীকে দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের জন্য আধুনিক পরিকাঠামো প্রয়োজন। ‘বনতারা’-র মতো বিশেষায়িত কেন্দ্র সেই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
তবে শিল্প বিনিয়োগের বিষয়টিই এই বৈঠকের মূল কেন্দ্রবিন্দু। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে আম্বানি পরিবারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এর অর্থ হল সরকার শুধু ঐতিহ্যবাহী শিল্পের দিকে তাকিয়ে নেই, বরং প্রযুক্তি ও নতুন অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে।
বর্তমানে রাজ্যগুলির মধ্যে শিল্প বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রতিযোগিতা ক্রমশ বাড়ছে। বড় শিল্পগোষ্ঠী কোনও প্রকল্প স্থাপনের আগে জমি, পরিকাঠামো, বিদ্যুৎ, পরিবহণ, দক্ষ শ্রমিক, নীতিগত স্থিরতা এবং ব্যবসার পরিবেশের মতো একাধিক বিষয় বিবেচনা করে। তাই শুধুমাত্র শিল্পপতিদের সঙ্গে বৈঠক করলেই বিনিয়োগ নিশ্চিত হয় না। বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করাও সরকারের বড় দায়িত্ব। শুভেন্দু অধিকারীর সরকার সেই পরিবেশ তৈরির উপর জোর দিচ্ছে বলে সাম্প্রতিক একাধিক পদক্ষেপ থেকে বোঝা যাচ্ছে।
এরই মধ্যে রাজ্যে আরও কয়েকটি বড় শিল্পপ্রকল্প নিয়ে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। আদানি গোষ্ঠীর প্রস্তাবিত নিউ টাউন এলাকার ২,০০০ শয্যার হাসপাতাল প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কর্মসূচিও রয়েছে। পাশাপাশি হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের সম্প্রসারণ প্রকল্প উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলিকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগের একটি ধারাবাহিকতা তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
মুকেশ আম্বানির সঙ্গে বৈঠক সেই বৃহত্তর শিল্পনীতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পশ্চিমবঙ্গে যদি রিলায়েন্স নতুন প্রকল্প আনে, তাহলে রাজ্যের শিল্প মানচিত্রে তার প্রভাব উল্লেখযোগ্য হতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তি ও নতুন শক্তি-ভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ এলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন ধরনের চাকরির বাজার তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলির সঙ্গেও শিল্পের যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রীর পোস্টে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। মুম্বইয়ে আম্বানি পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় গণেশের সামনে প্রার্থনা করার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। দেশের সুখ, শান্তি, অগ্রগতি এবং সমৃদ্ধির জন্য আশীর্বাদ চাওয়ার কথাও জানিয়েছেন। পাশাপাশি আম্বানি পরিবারের হাতে মা কালীর একটি বিশেষ মূর্তি তুলে দিতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছেন বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এই সাক্ষাৎ তাই শুধুমাত্র একটি কর্পোরেট বৈঠক ছিল না—দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেও তা দেখা হচ্ছে। শিল্পপতি পরিবারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী। অন্যদিকে, আম্বানি পরিবারের পক্ষ থেকেও বাংলার শিল্প সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তবে সম্ভাবনা এবং বাস্তব বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এই বৈঠকের পর রিলায়েন্স পশ্চিমবঙ্গে ঠিক কোন প্রকল্পে কত টাকা বিনিয়োগ করবে, তার কোনও চূড়ান্ত ঘোষণা এখনও হয়নি। ফলে আপাতত এই বৈঠককে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা উচিত। আগামী দিনে দুই পক্ষের মধ্যে আরও আলোচনা, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদনের পরেই বিনিয়োগের বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
রাজ্যের অর্থনীতির জন্য শিল্প বিনিয়োগের গুরুত্ব নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। নতুন কারখানা বা প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প তৈরি হলে সরাসরি কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরিকাঠামো উন্নয়ন, পরিষেবা খাতের সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় ব্যবসার বৃদ্ধি ঘটতে পারে। একই সঙ্গে রাজ্যের রাজস্বও বাড়তে পারে। পশ্চিমবঙ্গের বিপুল যুব জনসংখ্যাকে দক্ষতার সঙ্গে শিল্পের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে কর্মসংস্থানের সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যেও সেই বিষয়টিই বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। রাজ্যের যুবকদের দক্ষতা এবং শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বড় আকারে কাজের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব বলে তিনি জানিয়েছেন। শিল্পগোষ্ঠীগুলিকে সেই কাজে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
সব মিলিয়ে, মুম্বইয়ে মুকেশ আম্বানির সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর বৈঠক পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। রাজ্য সরকার বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে এবং প্রযুক্তি, নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রকে একসঙ্গে সামনে রাখছে। রিলায়েন্সের পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গের শিল্প সম্ভাবনায় আগ্রহ প্রকাশ এবং আরও বিনিয়োগের ইঙ্গিত আশাব্যঞ্জক হলেও, এখন নজর থাকবে সেই আগ্রহ কতটা বাস্তব প্রকল্পে পরিণত হয় তার দিকে। যদি আলোচনার পর বাস্তব বিনিয়োগ আসে, তাহলে তা পশ্চিমবঙ্গের শিল্পক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।


