রাজস্থানের জয়পুরের রামপুরা গ্রামে জীর্ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের পর অবশেষে বড় পদক্ষেপ করল প্রশাসন। বুধবার বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হল পুরনো স্কুল ভবন। সেখানে এবার নতুন করে স্কুল তৈরির কাজ শুরু হবে। স্কুলটির বেহাল পরিকাঠামো নিয়ে গত মাসে ককরোচ জনতা পার্টি (CJP) ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচির মাধ্যমে সরব হয়েছিল। সেই কর্মসূচিতে স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে দলের প্রতিনিধিরা স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়েন এবং দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের অভিযোগও ওঠে। ঘটনার পর বিষয়টি জাতীয় স্তরে আলোচনায় আসে।
জয়পুরের বাগরু বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত রামপুরা কানওয়ারপুরা গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির পুরনো ভবনকে আগেই বিপজ্জনক বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রযুক্তিগত সমীক্ষার পর ভবনটি ব্যবহারের অনুপযুক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়। এরপর সেখানে নিয়মিত ক্লাস করা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু নতুন ভবন তৈরি না হওয়ায় পড়ুয়াদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে হয়। প্রায় ১৮ জন পড়ুয়া কখনও গাছের নিচে, কখনও গ্রামবাসীদের তৈরি টিনের ছাউনিতে ক্লাস করত। সেই অস্থায়ী জায়গার কাছেই গবাদি পশু রাখার ব্যবস্থাও ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
### ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযান ঘিরে উত্তেজনা
সরকারি স্কুলগুলির পরিকাঠামোগত সমস্যা সামনে আনতে CJP দেশজুড়ে ‘স্কুল ঠিক করো’ নামে কর্মসূচি শুরু করেছে। সেই কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত ২১ আগস্ট রামপুরার স্কুলটি পরিদর্শনে যায় CJP-র একটি প্রতিনিধি দল। দলের নেতৃত্বে ছিলেন সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা। কিন্তু গ্রামে ঢোকার পর তাঁদের বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। পরিস্থিতি পরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং পাথর ছোড়া, গাড়ির কাচ ভাঙা ও মারধরের অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনায় দু’পক্ষই পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করে।
CJP-র তরফে অভিযোগ করা হয়েছিল, স্থানীয় কয়েকজন তাঁদের স্কুল পরিদর্শনে বাধা দেন। অন্যদিকে, স্থানীয়দের বিরুদ্ধেও অভিযোগ দায়ের করা হয়। ফলে একটি সরকারি স্কুলের বেহাল অবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া পরিদর্শন পরবর্তীতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কের আকার নেয়। ঘটনার পর স্কুলটির পরিস্থিতি নিয়ে আরও বেশি আলোচনা শুরু হয় এবং প্রশাসনের ওপরও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ তৈরি হয়।
### ১৮ লক্ষ টাকা বরাদ্দের অনুমোদন
তবে নতুন স্কুল ভবন তৈরির অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি CJP-র পরিদর্শনের আগেই অনুমোদিত হয়েছিল বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বাগরুর বিধায়ক কৈলাশ বর্মার বক্তব্য অনুযায়ী, গত ১৩ আগস্টই স্কুলের জন্য মোট ১৮ লক্ষ টাকা অনুমোদন করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১২ লক্ষ টাকা জেলা খনিজ ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট বা DMFT-এর তহবিল থেকে এবং বাকি ৬ লক্ষ টাকা বিধায়ক স্থানীয় উন্নয়ন তহবিল থেকে দেওয়ার কথা।
অর্থাৎ, স্কুলের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য আর্থিক অনুমোদন CJP-র ২১ আগস্টের পরিদর্শনের আগেই হয়ে গিয়েছিল। তবে পুরনো ভবন ভেঙে নতুন নির্মাণের কাজ শুরু হয় পরবর্তীতে। এই কারণেই স্কুলের উন্নয়নের কৃতিত্ব নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর তৈরি হয়েছে। CJP নিজেদের ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযানের সাফল্য হিসেবে ঘটনাটিকে তুলে ধরেছে। অন্যদিকে স্থানীয় BJP বিধায়ক জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা আগেই করা হয়েছিল।
### আশুতোষ রাঙ্কার প্রতিক্রিয়া
বুধবার পুরনো ভবন ভাঙার ভিডিও সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন CJP-র সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা। তিনি জানান, রামপুরার যে স্কুলে আগে গবাদি পশুর গোয়ালের মতো পরিবেশে পড়াশোনা চলছিল, সেখানে এবার নতুন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। পরিদর্শনের সময় তাঁদের উপর হামলার অভিযোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
রাঙ্কার বক্তব্যের মূল সুর ছিল, শিশুদের জন্য একটি ভালো স্কুল তৈরি হলেই তাঁদের অভিযানের উদ্দেশ্য পূরণ হবে। তাঁর দাবি, পরিদর্শনের সময় তাঁদের দলের সদস্যদের পাথর ছোড়া হয়েছিল, মহিলা সদস্যদের উপর হামলা এবং গাড়ির কাচ ভাঙার মতো ঘটনাও ঘটেছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য আলাদা এবং পুলিশি মামলার প্রক্রিয়াও রয়েছে।
### নতুন ভবনে থাকবে দুইটি শ্রেণিকক্ষ
প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন স্কুল ভবনের নির্মাণে মোট ১৮ লক্ষ টাকা খরচ হবে। এর মধ্যে ১২ লক্ষ টাকা দিয়ে দুটি শ্রেণিকক্ষ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি ৬ লক্ষ টাকার মাধ্যমে অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ করা হবে। স্থানীয়দের একাংশও নির্মাণকাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং কাজের মান যাতে ঠিক থাকে, সেদিকেও নজর রাখার কথা জানিয়েছেন।
স্কুলের শিক্ষক আশার বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন ভবন তৈরি হওয়ায় শিক্ষক ও পড়ুয়াদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, নতুন ভবনে শৌচাগার এবং অফিসের মতো প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোও থাকা দরকার বলে তিনি জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে অস্থায়ী জায়গায় ক্লাস করার পর স্থায়ী ভবন তৈরি হলে পড়ুয়াদের শিক্ষার পরিবেশ অনেকটাই উন্নত হবে বলে আশা স্থানীয়দের।
### রাজস্থানজুড়ে সরকারি স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন
রামপুরার ঘটনা অবশ্য রাজস্থানের সরকারি স্কুলগুলির পরিকাঠামো নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে এনেছে। গত বছর ঝালাওয়ারের পিপলোদিতে একটি সরকারি স্কুলে ছাদ ধসে পড়ে কয়েকজন পড়ুয়ার মৃত্যু এবং বহুজন আহত হওয়ার পর রাজস্থান হাই কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে স্কুলগুলির বেহাল ভবন নিয়ে বিষয়টি বিবেচনা করেছিল। পরবর্তীতে রাজ্য সরকার স্কুল পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য পাঁচ বছরের একটি কর্মপরিকল্পনার কথা আদালতকে জানিয়েছিল। সেই পরিকল্পনার আনুমানিক ব্যয় ছিল ১২,৫০০ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই কাজ তিন বছরের মধ্যে দ্রুত বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে NDTV জানিয়েছে।
এদিকে রাজস্থান প্রশাসন সরকারি স্কুলগুলিতে নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শনের ওপরও জোর দিচ্ছে। রাজ্যের মুখ্যসচিব ভি. শ্রীনিবাসের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক বৈঠকে স্কুল শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকারি স্কুলে নিরাপদ ভবন, পরিষ্কার পানীয় জল এবং স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের মতো মৌলিক সুবিধা দ্রুত নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরে স্কুল পরিকাঠামো শক্তিশালী করতে প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের কথাও প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে।
### নতুন স্কুল ঘিরে আশার আলো
রামপুরার পুরনো ভবন ভেঙে নতুন স্কুল তৈরির কাজ শুরু হওয়ায় আপাতত সবচেয়ে বড় স্বস্তি পড়ুয়া ও তাঁদের পরিবারের জন্য। এতদিন যে শিশুরা অস্থায়ী টিনের ছাউনির নিচে বা গাছের তলায় পড়াশোনা করতে বাধ্য হচ্ছিল, তারা এবার একটি স্থায়ী ও নিরাপদ স্কুল ভবন পাওয়ার অপেক্ষায়।
এই ঘটনায় রাজনৈতিক কৃতিত্ব নিয়ে বিতর্ক থাকলেও শেষ পর্যন্ত স্থানীয় পড়ুয়াদের জন্য নতুন পরিকাঠামো তৈরি হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। CJP তাদের অভিযানকে এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে, আর স্থানীয় বিধায়ক ও প্রশাসনের দাবি, নতুন ভবনের অর্থ ও পরিকল্পনার প্রক্রিয়া আগেই শুরু হয়েছিল। সেই বিতর্কের বাইরে এখন নজর একটাই—নতুন স্কুল ভবন কত দ্রুত তৈরি হয় এবং সেখানে পড়ুয়াদের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ কতটা নিশ্চিত করা যায়।


