মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সংঘাত এবার আরও বড় আকার নিল। হোয়াইট হাউসের তরফে CNN-কে প্রেস অ্যাক্সেস থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে প্রেসিডেন্টের যৌথ টেলিভিশন কভারেজ স্থগিত করল আমেরিকার একাধিক বড় সংবাদমাধ্যম। ABC News, CBS News, NBC News, Fox News এবং CNN—এই পাঁচটি নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে তৈরি প্রেসিডেন্সিয়াল টেলিভিশন পুল সাধারণত প্রেসিডেন্টের সরকারি অনুষ্ঠান, সফর এবং গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির ভিডিও কভারেজ তৈরি করে তা অন্য সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ভাগ করে নেয়। কিন্তু CNN-কে নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করতে বাধা দেওয়ার পর সেই পুলই ট্রাম্পের অনুষ্ঠানগুলির কভারেজ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হোয়াইট হাউসের তরফে CNN, MS NOW এবং Politico-কে প্রেসিডেন্টের দপ্তরের ভিতরে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করার সিদ্ধান্তকে ঘিরে। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, ওই সংবাদমাধ্যমগুলি তাঁর প্রশাসন সম্পর্কে ‘ভুয়ো’ বা নেতিবাচক খবর প্রকাশ করছে। ট্রাম্প নিজেও এই সিদ্ধান্তের পক্ষে প্রকাশ্যে সওয়াল করেছেন। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলির দাবি, সমালোচনামূলক খবর প্রকাশ করার কারণে কোনও প্রশাসনের পক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার কেড়ে নেওয়া সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিপন্থী। এই দ্বন্দ্ব থেকেই তৈরি হয়েছে নতুন সংকট।
সোমবার পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। CNN-এর নির্ধারিত ছিল হোয়াইট হাউস টেলিভিশন পুলের দায়িত্ব পালন করা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিউইয়র্ক সফর এবং রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের কর্মসূচির জন্যও CNN-এর কভারেজ করার কথা ছিল। কিন্তু হোয়াইট হাউসের নিষেধাজ্ঞার কারণে CNN সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। এরপরই পুলের বাকি সদস্য নেটওয়ার্কগুলি CNN-এর জায়গায় অন্য কোনও সংবাদমাধ্যমকে দায়িত্ব দিয়ে স্বাভাবিকভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে যৌথ কভারেজ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই টেলিভিশন পুলের কাজ সাধারণ দর্শকের কাছে হয়তো খুব পরিচিত নয়, কিন্তু মার্কিন সংবাদব্যবস্থায় এর গুরুত্ব যথেষ্ট। প্রেসিডেন্ট যখন হোয়াইট হাউস থেকে বাইরে যান বা কোনও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মসূচিতে অংশ নেন, তখন একসঙ্গে প্রত্যেক সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা নিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। সেই কারণেই ABC, CBS, NBC, Fox News এবং CNN পালা করে প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান ও সফরের ভিডিও ধারণ করে। পরে সেই ফুটেজ অন্য সংবাদমাধ্যমগুলির কাছেও সরবরাহ করা হয়। ফলে একটি ভিডিও থেকেই বহু টেলিভিশন চ্যানেল এবং সংবাদমাধ্যম প্রেসিডেন্টের কর্মসূচি সম্প্রচার করতে পারে।
কিন্তু এবার সেই দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাতেই বড় ধাক্কা এসেছে। CNN-কে তার নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করতে না দেওয়ার পর পুলের বাকি সদস্যরাও ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিয়াল ইভেন্টের ভিডিও কভারেজ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তকে সংবাদমাধ্যমগুলির মধ্যে বিরল ঐক্যের নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, ABC, CBS, NBC এবং Fox News—এই নেটওয়ার্কগুলির রাজনৈতিক অবস্থান ও সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। তবুও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সরকারের কার্যকলাপ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছে স্বাধীন তথ্য পৌঁছনোর প্রশ্নে তারা একই অবস্থান নিয়েছে।
নেটওয়ার্কগুলির যৌথ বক্তব্যে বলা হয়েছে, সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নির্ভুল এবং স্বাধীন তথ্য পাওয়ার অধিকার সাধারণ মানুষের রয়েছে। কোনও প্রশাসন শুধুমাত্র কোনও সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট পছন্দ না হওয়ার কারণে তাকে সরকারি কর্মকাণ্ডের কভারেজ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে না—এই বক্তব্যই মূলত সামনে এসেছে। সংবাদমাধ্যমগুলির মতে, কোনও নির্দিষ্ট রিপোর্ট বা সম্পাদকীয় অবস্থানের কারণে সাংবাদিকদের সরকারি অনুষ্ঠানে প্রবেশাধিকার সীমিত করা হলে ভবিষ্যতে আরও বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে।
এদিকে CNN, MS NOW এবং Politico ইতিমধ্যেই আইনি পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিন সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, হোয়াইট হাউসের এই নিষেধাজ্ঞা মার্কিন সংবিধানের First Amendment-এ সুরক্ষিত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করছে। তাঁরা আদালতের কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপের আবেদনও জানিয়েছেন। ফলে সংবাদমাধ্যম বনাম প্রেসিডেন্টের এই সংঘাত এখন শুধু রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, আদালতের লড়াইয়েও প্রবেশ করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কিছু সংবাদমাধ্যম ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ করছে। সেই কারণেই তাদের প্রেস অ্যাক্সেস নিয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই CNN-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যমকে তাঁর বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট এবং ভুয়ো খবর প্রচারের অভিযোগ করে আসছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তাঁর সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, প্রেসিডেন্টের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কর্মসূচির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়েছে। ট্রাম্প রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাওয়ার কথা ছিল। সেই সফরের ভিডিও কভারেজের দায়িত্ব CNN-এর উপর পড়েছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে CNN দায়িত্ব পালন করতে না পারায় প্রেসিডেন্সিয়াল টেলিভিশন পুলও ট্রাম্পের সফরের যৌথ ভিডিও কভারেজ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে এমন একটি আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ সফর ঐতিহ্যবাহী টেলিভিশন পুলের ক্যামেরা ছাড়াই কভার হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এই সিদ্ধান্তের ফলে অবশ্য ট্রাম্পের খবর সম্পূর্ণভাবে সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়নি। সংবাদপত্র, রেডিও, ওয়্যার সার্ভিস এবং অন্যান্য সাংবাদিকরা প্রেসিডেন্টের কর্মসূচি সম্পর্কে খবর প্রকাশ করতে পারেন। অর্থাৎ, নিষেধাজ্ঞাটি মূলত টেলিভিশন প্রেস পুলের যৌথ ভিডিও কভারেজকে কেন্দ্র করে। তবে প্রেসিডেন্টের সরাসরি ভিডিও ফুটেজ না পাওয়া টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমগুলির জন্য অবশ্যই একটি বড় পরিবর্তন।
হোয়াইট হাউসও পরিস্থিতির মোকাবিলায় নিজস্ব যোগাযোগব্যবস্থার উপর জোর দিচ্ছে। প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিজস্ব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের উদ্যোগ দেখা গেছে। তবে সাংবাদিক মহলের বক্তব্য, সরকারি দপ্তরের নিজস্ব সম্প্রচার কখনও স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের বিকল্প হতে পারে না। কারণ সরকারি ভিডিওতে শুধু প্রশাসনের পছন্দের বিষয়গুলি তুলে ধরা হতে পারে, যেখানে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম প্রশ্ন, অনুসন্ধান এবং ভিন্নমত তুলে ধরার সুযোগ রাখে।
বিশেষজ্ঞদের কাছে এই ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বৃহত্তর প্রশ্নে। মার্কিন সংবিধানের First Amendment সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে বিশেষ সুরক্ষা দেয়। কোনও প্রেসিডেন্ট কোনও সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট পছন্দ না করলেই তাকে সরকারি তথ্য বা কর্মসূচি থেকে দূরে রাখতে পারেন কি না, তা নিয়েই এখন আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। CNN, MS NOW এবং Politico-র মামলায় আদালত কী অবস্থান নেয়, তার উপর ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি হতে পারে।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন এবং সংবাদমাধ্যমের মধ্যে প্রেস অ্যাক্সেস নিয়ে একাধিক সংঘাত হয়েছে। Associated Press-সহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রেও প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় CNN, MS NOW এবং Politico-কে হোয়াইট হাউস থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে অনেকেই সংবাদমাধ্যমের উপর প্রশাসনিক চাপ বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দেখছেন। যদিও হোয়াইট হাউস বলছে, তাদের সিদ্ধান্ত সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টের মান এবং নির্ভুলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
অন্যদিকে, পাঁচটি বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্কের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত এই সংঘাতকে আরও বড় মাত্রা দিয়েছে। সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বী সংবাদমাধ্যমগুলি নিজেদের দর্শক এবং ব্যবসায়িক স্বার্থে আলাদা আলাদাভাবে কাজ করে। কিন্তু এবার CNN-এর উপর নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে Fox News-সহ অন্যান্য বড় নেটওয়ার্কগুলিও একসঙ্গে প্রেসিডেন্টের পুল কভারেজ বন্ধ করেছে। ফলে ঘটনাটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল একটি মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এখন গোটা পরিস্থিতির পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে আদালতের সিদ্ধান্ত এবং হোয়াইট হাউসের অবস্থানের উপর। CNN, MS NOW এবং Politico-র মামলা যদি আদালতে গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকারের বিষয়ে কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ আসে, তাহলে পরিস্থিতির মোড় বদলাতে পারে। আবার ট্রাম্প প্রশাসন যদি নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখে, তাহলে সংবাদমাধ্যম ও সরকারের সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, CNN-কে হোয়াইট হাউস থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত যে শুধু একটি সংবাদমাধ্যমকে প্রভাবিত করেনি, তার প্রমাণ মিলেছে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে। ABC, CBS, NBC, Fox News এবং CNN-এর টেলিভিশন পুল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যৌথ ভিডিও কভারেজ স্থগিত করেছে। একদিকে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘ভুয়ো খবর’ সংক্রান্ত অভিযোগ, অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমগুলির স্বাধীন সাংবাদিকতার অধিকার রক্ষার দাবি। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আদালতের লড়াইও। ফলে মার্কিন রাজনীতি এবং সংবাদমাধ্যমের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই সংঘাত আগামী দিনগুলিতে আরও বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।


