একসময় আন্তর্জাতিক বাজারে খেলনার ক্ষেত্রে **‘Made in China’**-এরই একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই ছবিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে **‘Made in India’** খেলনা। ঐতিহ্যবাহী কাঠের খেলনা থেকে শুরু করে আধুনিক STEM কিট, শিক্ষামূলক খেলনা, সফট টয় এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য—ভারতীয় খেলনার চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। সরকারের **‘Make in India’** এবং **‘Vocal for Local’** উদ্যোগ, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং দেশীয় উৎপাদনের প্রসারের ফলে ভারতের খেলনা শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন পরিচিতি পেয়েছে।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত এখন বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে খেলনা রপ্তানি করছে। ভারতীয় খেলনার জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হল উন্নত মান, নিরাপত্তা, আকর্ষণীয় নকশা এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন। চেন্নাপট্টনার (কর্নাটক), কন্ডাপল্লি (আন্ধ্রপ্রদেশ), এটিকোপ্পাকা এবং বারাণসীর কাঠের খেলনার মতো বহু ঐতিহ্যবাহী খেলনা আন্তর্জাতিক বাজারেও বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে। এই খেলনাগুলির অনেকগুলিই **Geographical Indication (GI)** স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।
কেন্দ্র সরকারের উদ্যোগে খেলনা শিল্পে **BIS (Bureau of Indian Standards)**-এর বাধ্যতামূলক মান নিয়ন্ত্রণ চালু হওয়ার পর দেশীয় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে নিম্নমানের আমদানিকৃত খেলনার প্রবেশ কমেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে খেলনা আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং দেশীয় নির্মাতারা আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় খেলনার আরেকটি বড় শক্তি হল পরিবেশবান্ধব উৎপাদন। কাঠ, বাঁশ, প্রাকৃতিক রং এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান দিয়ে তৈরি বহু খেলনা শিশুদের জন্য নিরাপদ হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতিও কম করে। এই কারণে ইউরোপ, আমেরিকা এবং অন্যান্য উন্নত দেশেও ভারতীয় খেলনার চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে হাতে তৈরি খেলনা এবং ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পভিত্তিক পণ্যের প্রতি বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অন্যদিকে, শুধু ঐতিহ্যবাহী খেলনাই নয়, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর খেলনা উৎপাদনেও ভারত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি, শিক্ষামূলক STEM খেলনা, ইলেকট্রনিক গেম এবং উদ্ভাবনী শিশু শিক্ষাসামগ্রী তৈরিতে একাধিক ভারতীয় সংস্থা বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে নতুন খেলনা উৎপাদন কেন্দ্র এবং গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) সুবিধাও গড়ে তোলা হচ্ছে।
খেলনা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তাদের মতে, এই খাতের প্রসারের ফলে শুধু রপ্তানিই বাড়ছে না, কর্মসংস্থানেরও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (MSME), মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং ঐতিহ্যবাহী কারিগররা এর মাধ্যমে নতুন বাজার পাচ্ছেন। গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন শিল্প বিশেষজ্ঞরা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে শিশুদের মধ্যে ডিজিটাল কনটেন্টের জনপ্রিয়তা বাড়লেও তার প্রভাব খেলনার বাজারে নেতিবাচক নয়। বরং জনপ্রিয় চরিত্র, অ্যানিমেশন এবং শিক্ষামূলক ডিজিটাল কনটেন্ট শিশুদের বাস্তব খেলনার প্রতিও আগ্রহী করে তুলছে। ফলে আধুনিক ও সৃজনশীল ভারতীয় খেলনার চাহিদা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই শিল্পের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, পরিবহণ ব্যয় এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গবেষণা, ডিজাইন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বিপণনে আরও বিনিয়োগ করলে ভারতীয় খেলনা শিল্প বিশ্ববাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
সব মিলিয়ে, **‘Made in India’** খেলনা আজ শুধু দেশীয় বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও নতুন পরিচিতি তৈরি করেছে। ঐতিহ্য, সৃজনশীলতা, নিরাপত্তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে ভারতীয় খেলনা শিল্প দ্রুত এগিয়ে চলেছে। আগামী দিনে উৎপাদন, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই শিল্প আরও বড় ভূমিকা নেবে বলেই আশাবাদী বিশেষজ্ঞরা।


