কলকাতায় **বাল্যবিবাহ রোধে আরও কঠোর অবস্থান** নিল লালবাজার। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক নাবালিকা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনা সামনে আসার পর কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে নতুন কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসার সময় নাবালিকা বিবাহের তথ্য প্রকাশ্যে আসায়, পুলিশ এবার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি, প্রয়োজনে **পকসো (POCSO) আইন** এবং **বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন** অনুযায়ী কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
লালবাজার সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি দক্ষিণ কলকাতা ও উত্তর শহরতলির একাধিক ঘটনায় চিকিৎসকদের মাধ্যমে জানা যায় যে, অন্তঃসত্ত্বা কয়েকজন কিশোরীর বয়স ১৮ বছরের কম। পরিচয়পত্র যাচাইয়ের পর বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। এরপর সংশ্লিষ্ট থানায় নাবালিকাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে পকসো আইন এবং বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এই ঘটনাগুলির পর কলকাতা পুলিশের শীর্ষকর্তারা প্রতিটি থানাকে আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশ কমিশনারের নির্দেশ অনুযায়ী, শহরে বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণভাবে রোধ করার লক্ষ্যে বিশেষ নজরদারি চালানো হবে। কোথাও নাবালিকার বিয়ের খবর পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুধু আইন প্রয়োগই নয়, সচেতনতাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে লালবাজার। পুলিশ জানিয়েছে, শহরের বিভিন্ন স্কুলে আবারও সচেতনতামূলক কর্মসূচি শুরু করা হবে। স্কুলের ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক এবং শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন পাড়া, ক্লাব এবং স্থানীয় সংগঠনগুলিকেও এই প্রচারে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের একাংশের মতে, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে পরিচয়ের পর নাবালক-নাবালিকারা বিয়ে করছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে পরিবারের চাপে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, সমাজের সব স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি।
শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, বাল্যবিবাহের ফলে কিশোরীদের শিক্ষা ব্যাহত হয়, অল্প বয়সে মাতৃত্বের ঝুঁকি বাড়ে এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। সেই কারণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ের সঙ্গে বিয়ে এবং নাবালিকার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে পকসো আইন প্রযোজ্য হতে পারে। তাই এই ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, অনেক সময় স্থানীয় মানুষ বাল্যবিবাহের খবর জানলেও প্রশাসনকে অবহিত করেন না। ফলে বিয়ের পর যখন নাবালিকা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যান, তখনই বিষয়টি সামনে আসে। এই প্রবণতা বদলাতে সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। সন্দেহজনক কোনও ঘটনা নজরে এলে দ্রুত থানায় বা প্রশাসনের কাছে জানাতে বলা হয়েছে |
সমাজকর্মীদের মতে, বাল্যবিবাহ রোধে শুধু পুলিশ বা প্রশাসনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পরিবার, বিদ্যালয়, স্থানীয় ক্লাব, স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির যৌথ ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিশোরী শিক্ষার প্রসার এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে, **কলকাতায় বাল্যবিবাহ রুখতে লালবাজারের নতুন কড়া পদক্ষেপ** প্রশাসনের কঠোর অবস্থানেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী দিনে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই ধরনের অপরাধ রোধে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


