ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান সমর্থকদের জন্য বড় সুখবর। গত মরশুমে ইন্ডিয়ান সুপার লিগ বা আইএসএলের সম্প্রচার নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ও সমস্যা তৈরি হয়েছিল, এবার তা অনেকটাই কাটতে চলেছে। নতুন মরশুমে ফুটবলপ্রেমীদের যাতে ম্যাচ দেখতে খুব বেশি সমস্যায় পড়তে না হয়, তার জন্য একাধিক মাধ্যমে সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। টেলিভিশনের পাশাপাশি আইএসএলের ম্যাচ দেখা যাবে ইউটিউবেও। ফলে স্মার্টফোন, কম্পিউটার কিংবা স্মার্ট টিভি ব্যবহার করে সহজেই ম্যাচ উপভোগ করতে পারবেন দর্শকরা। সবচেয়ে বড় বিষয়, আইএসএলের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলেও ম্যাচ দেখা যাবে। পাশাপাশি জি স্পোর্টসেও সম্প্রচারের ব্যবস্থা থাকছে।
নতুন মরশুমের আইএসএল শুরু হতে চলেছে আগামী **১০ অক্টোবর**। লিগ চলবে ২০২৭ সালের মে মাস পর্যন্ত। এবার মোট ১৩টি দলকে নিয়ে প্রতিযোগিতা হবে। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর এবার চিরাচরিত হোম-অ্যাওয়ে ফরম্যাটেই ফিরছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবল লিগ। অর্থাৎ প্রতিটি দল নিজেদের মাঠে যেমন খেলবে, তেমনই প্রতিপক্ষের মাঠেও গিয়ে ম্যাচ খেলবে। লিগ পর্ব শেষে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থাকা দলকে আইএসএল শিল্ড চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হবে। এরপর সেরা ছয় দল প্লে-অফে খেলবে আইএসএল কাপ জেতার জন্য। সব মিলিয়ে এবারের প্রতিযোগিতায় মোট **১৬৩টি ম্যাচ** হওয়ার কথা।
গত মরশুমে অবশ্য পরিস্থিতি একেবারেই অন্যরকম ছিল। আইএসএলের আয়োজক সংস্থা এফএসডিএল সরে যাওয়ার পর প্রতিযোগিতা আয়োজন নিয়ে বড়সড় জটিলতা তৈরি হয়। অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন বা এআইএফএফকে একাধিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী মনসুখ মান্ডব্যর দ্বারস্থ হতে হয়েছিল ফেডারেশনকে। দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর কোনওরকমে প্রতিযোগিতা আয়োজন করা সম্ভব হলেও গত মরশুমে আইএসএল হয়েছিল সিঙ্গল-লেগ ফরম্যাটে। ফলে স্বাভাবিক হোম-অ্যাওয়ে ম্যাচের উত্তেজনা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন ফুটবলপ্রেমীরা।
সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার শুরু থেকেই সতর্ক হয়েছে ফেডারেশন। আইএসএলকে নতুনভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ফেডারেশন এবং ক্লাবগুলির যৌথ মডেলে প্রতিযোগিতা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন সিইও নিয়োগ করা হয়েছে। আয়োজকদের অন্যতম লক্ষ্য হল, মাঠের প্রতিযোগিতার পাশাপাশি দর্শকদের কাছে ম্যাচ সম্প্রচারও যতটা সম্ভব সহজ করে তোলা। সেই পরিকল্পনারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ইউটিউব স্ট্রিমিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বর্তমান সময়ে ফুটবল দেখার ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। অনেক দর্শকের বাড়িতে কেবল টেলিভিশনের সংযোগ থাকলেও অনেকে আবার শুধুমাত্র মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে খেলা দেখেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অনলাইন স্ট্রিমিং অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাই ইউটিউবের মতো সহজলভ্য প্ল্যাটফর্মে আইএসএলের ম্যাচ দেখার সুযোগ থাকলে দর্শকদের কাছে প্রতিযোগিতাটি আরও বেশি পৌঁছবে বলে মনে করা হচ্ছে। যাঁরা টেলিভিশনে ম্যাচ দেখতে পারবেন না, তাঁরাও ইউটিউবের মাধ্যমে সরাসরি ম্যাচ অনুসরণ করতে পারবেন।
এর ফলে ইস্টবেঙ্গল এবং মোহনবাগানের সমর্থকদের মধ্যেও স্বস্তি ফিরতে পারে। দুই কলকাতা দলের ম্যাচ ঘিরে বরাবরই ব্যাপক উন্মাদনা থাকে। শুধু কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গেই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই দুই ক্লাবের সমর্থক ছড়িয়ে রয়েছেন। অতীতে সম্প্রচার সংক্রান্ত সমস্যার কারণে অনেক সমর্থক ম্যাচ দেখা নিয়ে সমস্যায় পড়েছিলেন। এবার ইউটিউবেও ম্যাচ দেখার সুযোগ থাকায় সেই সমস্যা অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এবারের আইএসএলে অবশ্য দলের সংখ্যায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। প্রথমে ১৪টি দলকে নিয়ে প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রয়োজনীয় অর্থ জমা দিতে না পারায় কলকাতার ডায়মন্ড হারবার এফসি প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়েছে। ফলে ১৩টি দল নিয়েই এবার লিগ শুরু হবে। এআইএফএফের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ডায়মন্ড হারবার এফসির ক্ষেত্রে অবনমনের নিয়মে কোনও ছাড় দেওয়া হবে না। অর্থাৎ দলটি লিগ টেবিলে শেষ স্থানে থাকবে এবং পরের মরশুমে দ্বিতীয় ডিভিশনের লিগে খেলতে হবে।
ডায়মন্ড হারবার এফসির বাদ পড়া বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের কাছেও বড় খবর। কারণ কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলের ফুটবলে ক্লাবটির সাম্প্রতিক উত্থান নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছিল। আইএসএলে নতুন দল হিসেবে তাদের খেলার সম্ভাবনা নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থ জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ আর হল না। ফলে এবার বাংলার প্রতিনিধিত্ব মূলত ইস্টবেঙ্গল এবং মোহনবাগানকে ঘিরেই আরও বেশি করে আলোচনায় থাকবে।
অন্যদিকে, আইএসএলের সম্প্রচার ব্যবস্থায় এবার একাধিক মাধ্যম থাকায় দর্শকদের পছন্দের সুযোগও বাড়ছে। টেলিভিশনে ম্যাচ দেখার পাশাপাশি অনলাইনেও সরাসরি ম্যাচ দেখা যাবে। আইএসএলের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল এবং জি স্পোর্টস—দুই জায়গাতেই ম্যাচ দেখার ব্যবস্থা থাকছে বলে জানানো হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ম্যাচ দেখার ক্ষেত্রে প্রবেশযোগ্যতা। অনেক সময় দর্শকরা টেলিভিশনের সামনে বসে পুরো ম্যাচ দেখার সুযোগ পান না। অফিস, পড়াশোনা, যাতায়াত কিংবা অন্য কোনও কাজের কারণে মোবাইলেই খেলা দেখতে হয়। ইউটিউবের মাধ্যমে ম্যাচ সম্প্রচার হলে সেই দর্শকদের জন্য অনেকটাই সুবিধা তৈরি হবে। বিশেষ করে স্মার্টফোনে সহজে ম্যাচ চালু করে দেখার সুযোগ থাকায় আইএসএলের দর্শকসংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এবার প্রতিযোগিতার কাঠামোও আগের স্বাভাবিক ফরম্যাটে ফিরছে। হোম-অ্যাওয়ে পদ্ধতিতে খেলা হওয়ায় প্রতিটি দলকে বিভিন্ন শহরে গিয়ে ম্যাচ খেলতে হবে। এর ফলে মাঠে দর্শকদের উপস্থিতিও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য নিজেদের প্রিয় দলের ঘরের মাঠে ম্যাচ দেখার পাশাপাশি অন্য শহরে গিয়ে দলের খেলা দেখার সুযোগও থাকবে। গত মরশুমের সিঙ্গল-লেগ ফরম্যাটের তুলনায় এটি নিঃসন্দেহে বড় পরিবর্তন।
লিগ পর্বের শেষে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থাকা দল সরাসরি শিল্ড জয়ের স্বীকৃতি পাবে। এরপর সেরা ছয় দল আইএসএল কাপের জন্য প্লে-অফে নামবে। ফলে লিগের শুরু থেকেই প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব থাকবে। একটি বা দুটি ম্যাচে পয়েন্ট হারালেই টেবিলে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবে। আবার শীর্ষে থাকার লড়াইও চলবে পুরো মরশুম জুড়ে। প্লে-অফে জায়গা করে নেওয়ার জন্য মাঝের সারির দলগুলির মধ্যেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখা যেতে পারে।
১০ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে আগামী বছরের মে পর্যন্ত চলবে এই দীর্ঘ ফুটবল মরশুম। অর্থাৎ বেশ কয়েক মাস ধরে দেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য টানা উত্তেজনা অপেক্ষা করছে। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগানসহ অন্যান্য দলের ম্যাচ ঘিরে সমর্থকদের আগ্রহও ধীরে ধীরে বাড়বে। তার সঙ্গে যদি সহজে এবং বিনামূল্যে অনলাইনে ম্যাচ দেখা যায়, তাহলে আইএসএলের জনপ্রিয়তা আরও বাড়তে পারে।
গত মরশুমের সম্প্রচার সমস্যা যে এআইএফএফের কাছে বড় শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবারের পরিকল্পনা থেকেই তা স্পষ্ট। প্রতিযোগিতা আয়োজনের পাশাপাশি দর্শকদের কাছে ম্যাচ পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিকেও এবার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন সিইও নিয়োগ, ফেডারেশন-ক্লাব যৌথ মডেল এবং একাধিক সম্প্রচার প্ল্যাটফর্ম—সব মিলিয়ে নতুন ব্যবস্থায় আইএসএলকে আরও সংগঠিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, নতুন আইএসএল মরশুম শুরু হওয়ার আগে সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর হল ম্যাচ দেখার ক্ষেত্রে দর্শকদের সমস্যা অনেকটাই কমতে চলেছে। ১০ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া প্রতিযোগিতার ম্যাচ টেলিভিশনের পাশাপাশি আইএসএলের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল এবং জি স্পোর্টসেও দেখা যাবে। ১৩টি দল, ১৬৩টি ম্যাচ, হোম-অ্যাওয়ে ফরম্যাট এবং সেরা ছয় দলের প্লে-অফ—সব মিলিয়ে এবারের আইএসএলকে ঘিরে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে প্রত্যাশা। গত মরশুমের অনিশ্চয়তার পর এবার মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি সম্প্রচার ব্যবস্থাও অনেক বেশি দর্শকবান্ধব করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান থেকে শুরু করে দেশের অন্যান্য ক্লাবের সমর্থকরাও নিজেদের পছন্দের দলকে সহজেই অনুসরণ করতে পারবেন।


