পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যেও বড় সাফল্যের দাবি করল ভারত সরকার। সংসদে দেওয়া এক লিখিত উত্তরে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক উপসাগরীয় (Gulf) সংকটের সময় **ভারতের জন্য পণ্য বহনকারী ৬০টি বাণিজ্যিক জাহাজ (Merchant Vessel)** নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। শুধু তাই নয়, এই সময়ে **৩,৯৭২ জন ভারতীয় নাবিককেও (Seafarers) নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।** সরকারের এই পদক্ষেপকে ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নাগরিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকার জানিয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছিল। এই জলপথ দিয়েই বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, এলপিজি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহণ করা হয়। ভারতও তার জ্বালানি আমদানির একটি বড় অংশ এই রুটের উপর নির্ভরশীল। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই কেন্দ্র সরকার, নৌপরিবহণ মন্ত্রক এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
সংসদে জানানো হয়েছে, সংকটের সময় **২৪ ঘণ্টা চালু ছিল একটি বিশেষ কন্ট্রোল রুম** এবং ডিরেক্টরেট জেনারেল অব শিপিং-এর যোগাযোগ কেন্দ্র। ভারতীয় জাহাজগুলির গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং প্রতিটি জাহাজের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ বজায় রাখা হয়। সম্ভাব্য বিপজ্জনক এলাকায় প্রবেশের আগে জাহাজগুলিকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নির্দেশনাও দেওয়া হয়। এই সমন্বিত ব্যবস্থার ফলেই ৬০টি জাহাজ নিরাপদে ভারতমুখী যাত্রা সম্পূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছে।
এছাড়াও সরকার জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত **৩,৯৭২ জন ভারতীয় নাবিককে** ধাপে ধাপে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবারগুলির সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়। প্রয়োজনে মানসিক সহায়তা এবং জরুরি পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল বলে সংসদে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ‘চোক পয়েন্ট’-গুলির একটি। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল পরিবহণের উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পন্ন হয়। ফলে এই রুটে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, পরিবহণ ব্যয় এবং বাণিজ্যের উপর বড় প্রভাব পড়তে পারে। ভারতের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই রুট সচল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার আরও জানিয়েছে, শুধুমাত্র জাহাজ চলাচলই নয়, ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তাকেও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকা জাহাজগুলিকে নিয়মিত সতর্কবার্তা পাঠানো, নিরাপদ রুট ব্যবহারের পরামর্শ এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। এর ফলে কোনও বড় ধরনের সামুদ্রিক দুর্ঘটনা বা ভারতীয় নাবিকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
সমুদ্র বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক উপসাগরীয় সংকট ভারতীয় সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতাকে নতুন করে তুলে ধরেছে। এত বড় সংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং হাজার হাজার নাবিককে দেশে ফিরিয়ে আনা সহজ কাজ নয়। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, নৌপরিবহণ মন্ত্রক এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের ফলেই এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে বলে তাঁদের মত।
যদিও পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়, তবুও ভারত সরকার জানিয়েছে যে তারা পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে। প্রয়োজনে ভবিষ্যতেও ভারতীয় জাহাজ, নাবিক এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সংসদে দেওয়া এই তথ্য থেকে স্পষ্ট, আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশের জ্বালানি সরবরাহ ও সামুদ্রিক বাণিজ্য স্বাভাবিক রাখতে ভারত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে।


