বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় মঞ্চে প্রতিটি ম্যাচই হয়ে ওঠে বিশেষ। আর যখন প্রতিপক্ষ মেক্সিকো এবং ম্যাচের ভেন্যু মেক্সিকো সিটির মতো উচ্চতায় অবস্থিত শহর, তখন প্রস্তুতিতেও থাকে বাড়তি বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা। এবার সেই প্রস্তুতি নিয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। কারণ, ইংল্যান্ড জাতীয় দলের ফুটবলারদের জন্য চিকিৎসকরা প্রয়োজনে **সিলডেনাফিল**, যা সাধারণ মানুষের কাছে ভায়াগ্রা নামে বেশি পরিচিত, ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করেছেন।
প্রথম শুনলে বিষয়টি অনেকের কাছেই অবাক লাগতে পারে। তবে এর সঙ্গে ব্যক্তিগত বা যৌনস্বাস্থ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এর নেপথ্যে রয়েছে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা।
মেক্সিকো সিটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এই উচ্চতায় বাতাসে অক্সিজেনের ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে যেসব ফুটবলার সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি পরিবেশে অনুশীলন করেন, তাঁদের শরীরের জন্য এমন পরিবেশে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া কঠিন হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে দৌড়, স্ট্যামিনা, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং ম্যাচের শেষভাগে পারফরম্যান্সের উপর।
ক্রীড়া চিকিৎসকদের মতে, সিলডেনাফিল ফুসফুসের রক্তনালী কিছুটা প্রসারিত করতে সাহায্য করে। এর ফলে শরীরে অক্সিজেন পরিবহন আরও কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে উচ্চতাজনিত শারীরিক চাপ কমানোর উদ্দেশ্যেই এই ওষুধ নিয়ে গবেষণা হয়েছে। সেই কারণেই ইংল্যান্ড দলের মেডিক্যাল বিভাগ এটি একটি সম্ভাব্য সহায়ক উপায় হিসেবে বিবেচনা করেছে।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। চিকিৎসকরা কোথাও বলেননি যে দলের প্রত্যেক ফুটবলার এই ওষুধ ব্যবহার করবেন। এটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে, প্রয়োজন এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা হতে পারে। অর্থাৎ এটি কোনো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নয়।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, উচ্চতায় খেলাধুলার ক্ষেত্রে সিলডেনাফিলের কিছু ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেলেও, সব গবেষণায় একই ফলাফল পাওয়া যায়নি। অনেক গবেষণায় বলা হয়েছে, মাঝারি উচ্চতায় এই ওষুধের পারফরম্যান্স বৃদ্ধির প্রভাব খুবই সীমিত। তাই এটি কোনো ‘ম্যাজিক ওষুধ’ নয়।
আরও একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে, এই ওষুধ ব্যবহার করলে তা কি ডোপিং হিসেবে ধরা হবে? উত্তর হল—না। বর্তমানে **বিশ্ব অ্যান্টি-ডোপিং সংস্থা (WADA)**-এর নিষিদ্ধ ওষুধের তালিকায় সিলডেনাফিল নেই। ফলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এর ব্যবহার আন্তর্জাতিক নিয়ম ভঙ্গ করে না।
আধুনিক ফুটবলে এখন শুধুমাত্র অনুশীলন বা কৌশলই নয়, বিজ্ঞান, পুষ্টি, ঘুম, শারীরিক পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশগত পরিস্থিতির উপরও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিভিন্ন জাতীয় দল ম্যাচের ভেন্যু অনুযায়ী বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কোথাও প্রচণ্ড গরম, কোথাও তীব্র ঠান্ডা, আবার কোথাও উচ্চতা—প্রতিটি পরিবেশের জন্য আলাদা প্রস্তুতি থাকে।
ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রেও বিষয়টি তার ব্যতিক্রম নয়। কোচিং স্টাফ এবং মেডিক্যাল টিমের মূল লক্ষ্য একটাই—খেলোয়াড়রা যেন সর্বোচ্চ ফিটনেস নিয়ে মাঠে নামতে পারেন এবং উচ্চতার প্রভাব যতটা সম্ভব কম অনুভব করেন।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে একটি ছোট ভুলও বড় মূল্য চুকিয়ে দিতে হতে পারে। তাই মাঠের বাইরের প্রস্তুতিও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা, চিকিৎসকদের পরামর্শ এবং আধুনিক ক্রীড়া প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ইংল্যান্ড দল নিজেদের প্রস্তুত করছে।
সব মিলিয়ে, “ভায়াগ্রা” শব্দটি নিয়ে যতটা চমক তৈরি হয়েছে, বাস্তবে বিষয়টি তার চেয়ে অনেক বেশি বৈজ্ঞানিক। এটি কোনো বিতর্কিত বা বেআইনি পদক্ষেপ নয়, বরং উচ্চতাজনিত শারীরিক সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি দৃষ্টিভঙ্গি। শেষ পর্যন্ত এই কৌশল মাঠে কতটা কার্যকর হয়, তার উত্তর মিলবে ম্যাচের ফলাফল এবং খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সেই।


