তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে চলতে থাকা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই বড় সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিলেন দলের সর্বভারতীয় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্য সভাপতি পদ থেকে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের আকস্মিক ইস্তফার পর আর কোনও নতুন মুখকে সামনে না এনে নিজেই পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণা করেছেন তিনি। এই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়েছে যে, দলের বর্তমান সংকটকালে সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই রাখতে চাইছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় |
শনিবার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ারপার্সন হিসেবে তিনি আজ থেকেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতির দায়িত্বও পালন করবেন। একই সঙ্গে তিনি দলীয় রাজ্য কমিটিতে নতুন রদবদলের কথাও ঘোষণা করেন। প্রবীণ নেতা মদন মিত্র এবং কুণাল ঘোষকে রাজ্য কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক মহল দলীয় সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখছে।
এর কয়েক ঘণ্টা আগেই চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য রাজ্য সভাপতির পদ-সহ দলের সমস্ত সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেন। শুধু তাই নয়, তিনি দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের অনুমোদিত স্বাক্ষরকারী এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে দলের অনুমোদিত প্রতিনিধির পদ থেকেও সরে দাঁড়ানোর কথা জানান। নিজের পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, দলের নেতৃত্বের আস্থা হারানোর কারণেই তাঁর পক্ষে কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছিল। যদিও তিনি স্পষ্ট করে জানান, দলের প্রতি তাঁর আনুগত্য নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই।
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের এই সিদ্ধান্তের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে নানা জল্পনা শুরু হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দলের অভ্যন্তরে সাংগঠনিক মতপার্থক্য এবং নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষের আবহ তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতির মধ্যেই তাঁর ইস্তফা দলকে নতুন করে চাপে ফেলে। তবে দলীয় নেতৃত্ব এই ঘটনাকে পূর্বপরিকল্পিত পদক্ষেপ বলে দাবি করেছে এবং সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ রাখার বার্তা দিয়েছে।
এদিকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সক্রিয়তাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। একাংশ নেতা নতুন সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির ঘোষণা দেন এবং দলীয় সদর দফতরকে কেন্দ্র করেও উত্তেজনা তৈরি হয়। এই অবস্থায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজে রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব নেওয়াকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তাঁর এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি দলীয় কর্মী ও নেতৃত্বকে স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, সংকটের সময় তিনি নিজেই সংগঠনের নেতৃত্বে থাকবেন |
রাজনৈতিক মহলের মতে, সামনে একাধিক সাংগঠনিক কর্মসূচি এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনের প্রস্তুতি রয়েছে। তাই এই সময়ে নেতৃত্বে কোনও অনিশ্চয়তা রাখতে চাননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজে রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তিনি সংগঠনের উপর সরাসরি নজরদারি চালাতে পারবেন এবং দ্রুত সিদ্ধান্তও নিতে পারবেন।
দলের অভ্যন্তরে এই পরিবর্তনের ফলে আগামী দিনে আরও সাংগঠনিক রদবদল হতে পারে বলেও জল্পনা শুরু হয়েছে। নতুন সাধারণ সম্পাদকদের কী দায়িত্ব দেওয়া হবে এবং রাজ্য কমিটিতে আর কোনও পরিবর্তন আনা হবে কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের।
সব মিলিয়ে, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পদত্যাগের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজে রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উঠে এসেছে। এখন এই সিদ্ধান্ত দলীয় সংগঠনকে কতটা ঐক্যবদ্ধ করতে পারে এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক লড়াইয়ে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটাই দেখার বিষয়।


