উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথে ফের সাময়িক দুর্ভোগের আশঙ্কা। বালাসন নদীর উপর দুধিয়ায় থাকা বেইলি ব্রিজ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট সময় বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই সেতু দিয়ে ছোট গাড়ি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। ফলে শিলিগুড়ি ও মিরিকের মধ্যে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষ, পর্যটক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েক ঘণ্টার জন্য বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হবে।
দার্জিলিং জেলা প্রশাসনের তরফে এই নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, বেইলি ব্রিজের নিয়মিত মাসিক রক্ষণাবেক্ষণের কাজের জন্যই এই সিদ্ধান্ত। তবে পাহাড়ি এলাকার যোগাযোগব্যবস্থায় দুধিয়া সেতুর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি হওয়ায় এই সাময়িক বন্ধের খবর ছড়িয়ে পড়তেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
## বালাসনের জলে বারবার বিপর্যস্ত দুধিয়ার যোগাযোগ
দুধিয়া এলাকায় বালাসন নদীর উপর থাকা পুরনো লোহার সেতুটি গত বছর উত্তরবঙ্গের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় ভেঙে যায়। গত বছরের ৪ অক্টোবর বালাসন নদীতে হড়পা বানের জেরে সেতুটি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে শিলিগুড়ি থেকে দুধিয়া হয়ে মিরিকের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে পূর্ত দপ্তরের পক্ষ থেকে অস্থায়ীভাবে হিউম পাইপ বসিয়ে একটি সেতু তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু পাহাড়ে ভারী বৃষ্টির কারণে গত জুন মাসে সেই অস্থায়ী সেতুর বেশ কিছু অংশও বালাসনের জলে ভেসে যায়। এর পরেই যোগাযোগ সচল রাখতে সেনাবাহিনীর ত্রিশক্তি কর্পসের সুকনা ৩৩ কোরের ৫ ইঞ্জিনিয়ারিং রেজিমেন্টের পক্ষ থেকে প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ বেইলি ব্রিজ তৈরি করা হয়।
বর্তমানে দুধিয়া এলাকার যোগাযোগের অন্যতম প্রধান ভরসা এই বেইলি ব্রিজ। তাই সেতুটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একদিন যান চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে স্থানীয়দের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই চিন্তা তৈরি হয়েছে।
## ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা বন্ধ
প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী, ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দুধিয়ার বেইলি ব্রিজ দিয়ে ছোট গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকবে। অর্থাৎ মোট ১২ ঘণ্টা সেতুটি সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হবে। এই সময়ে শিলিগুড়ি-মিরিক রুটে যাতায়াতকারী গাড়িগুলিকে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হবে।
যদিও নির্দেশিকায় মূলত ছোট গাড়ি চলাচল বন্ধের কথা বলা হয়েছে, তবুও সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের সময় এলাকার সামগ্রিক যান চলাচলে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পর্যটনের মরশুমে মিরিকমুখী গাড়ির চাপ বাড়লে এই সমস্যা আরও প্রকট হতে পারে।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, নির্ধারিত দিনে যদি কোনও কারণে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা সম্ভব না হয়, তাহলে একই সময় অর্থাৎ সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১৭ সেপ্টেম্বর সেতুটি বন্ধ রাখা হবে। ফলে যাত্রীদের ১৫ সেপ্টেম্বরের পাশাপাশি বিকল্প সম্ভাব্য তারিখটির কথাও মাথায় রাখতে বলা হচ্ছে।
## পর্যটক ও স্থানীয়দের ভোগান্তির আশঙ্কা
দুধিয়া হয়ে মিরিক যাওয়ার রাস্তা উত্তরবঙ্গের অন্যতম পরিচিত পর্যটনপথ। মিরিকের পাশাপাশি দুধিয়া, সুকনা এবং সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকার বহু মানুষ প্রতিদিন এই রাস্তা ব্যবহার করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের বাজার, চিকিৎসা, শিক্ষা, কর্মস্থল এবং অন্যান্য প্রয়োজনেও এই যোগাযোগপথ গুরুত্বপূর্ণ।
সেতু বন্ধ থাকলে পর্যটকদের ঘুরপথে যেতে হবে। এতে যাত্রার সময় বাড়বে এবং পরিবহণ খরচও বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা একদিনের জন্য মিরিক বা আশপাশের এলাকায় ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন, তাঁদের যাত্রাসূচিতে পরিবর্তন আনতে হতে পারে।
অন্যদিকে, স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং পর্যটননির্ভর ছোট ব্যবসাগুলিও সাময়িকভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। পর্যটকদের গাড়ি চলাচল কমে গেলে হোটেল, হোমস্টে, রেস্তোরাঁ এবং স্থানীয় দোকানগুলিতে তার প্রভাব পড়তে পারে।
## ভারী যান চলাচল আগেই বন্ধ
বালাসন নদীর জলস্তর হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার কারণে বৃহস্পতিবার রাতে দুধিয়ায় তৈরি অস্থায়ী হিউম পাইপের সেতুটি ভেসে যায়। এর পর থেকেই ওই এলাকায় পণ্যবাহী ভারী যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বেইলি ব্রিজের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ছোট গাড়ি চলাচলও সাময়িকভাবে বন্ধ হলে যোগাযোগব্যবস্থা আরও চাপে পড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য রক্ষণাবেক্ষণের কাজকে জরুরি বলে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্ষাকালে পাহাড়ি নদীর জলস্তর দ্রুত বাড়ে। ফলে সেতুর নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব বজায় রাখতে নিয়মিত পরিদর্শন এবং মেরামতি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কোনও বড় দুর্ঘটনা এড়াতেই আগাম এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
## নিরাপত্তার স্বার্থে সাময়িক বন্ধ
দুধিয়ার বেইলি ব্রিজ বর্তমানে শিলিগুড়ি-মিরিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। তাই সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ সম্পূর্ণ না করে যান চলাচল চালু রাখা হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। সেই কারণেই প্রশাসন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যান চলাচল বন্ধ রেখে কাজ শেষ করতে চাইছে।
যাত্রীদের ১৫ সেপ্টেম্বরের আগে যাত্রাপথ সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া এবং প্রয়োজনে বিকল্প রাস্তা বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হলে দ্রুত স্বাভাবিক যান চলাচল শুরু হবে বলেই আশা করা হচ্ছে।
দুধিয়ার যোগাযোগব্যবস্থা ইতিমধ্যেই একাধিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলেছে। পুরনো সেতু ভেঙে যাওয়া, অস্থায়ী হিউম পাইপের সেতু ভেসে যাওয়া এবং ভারী যান চলাচল বন্ধের পর এবার বেইলি ব্রিজের রক্ষণাবেক্ষণ—সব মিলিয়ে স্থানীয়দের কাছে এই পথ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। তাই সেতুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রুত এবং স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবিও জোরালো হচ্ছে।


