বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজোকে ঘিরে প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পুজো কমিটিগুলি থিম, মণ্ডপ নির্মাণ এবং প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত। এরই মধ্যে প্রকাশ্যে এসেছে এবারের **দুর্গাপুজোর পূর্ণ নির্ঘণ্ট**, যেখানে মহালয়া থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত বিভিন্ন তিথি, পূজার শুভক্ষণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়সূচির বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। এই নির্ঘণ্ট অনুসরণ করেই রাজ্যজুড়ে অধিকাংশ বারোয়ারি ও বনেদি বাড়ির পুজোর আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন হবে |
হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী দুর্গাপুজোর মূল পর্ব শুরু হয় **মহালয়ার** মাধ্যমে। এই দিন পিতৃপক্ষের অবসান ঘটে এবং দেবীপক্ষের সূচনা হয়। মহালয়ার পর দেবীর আগমনের আবহ তৈরি হয় এবং ষষ্ঠী থেকে শুরু হয় দুর্গাপুজোর মূল উৎসব। এরপর পর্যায়ক্রমে সপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী এবং বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনের উৎসব সম্পন্ন হয়। দুর্গাপুজোর এই তিথিগুলি চন্দ্রপঞ্জিকার উপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়, তাই প্রতি বছর গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে তারিখ পরিবর্তিত হয়।
প্রকাশিত নির্ঘণ্টে বোধন, আমন্ত্রণ, অধিবাস, নবপত্রিকা প্রবেশ, মহাস্নান, অষ্টমীর অঞ্জলি, সন্ধিপুজো, কুমারী পূজা, মহানবমীর হোম এবং বিজয়া দশমীর সিঁদুর খেলাসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আচার পালনের শুভ সময় উল্লেখ করা হয়েছে। পুরোহিতদের মতে, এই নির্ধারিত শুভক্ষণ মেনে পূজা সম্পন্ন করলে শাস্ত্রসম্মত বিধান যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হয়।
বিশেষ করে **মহাষ্টমীর অঞ্জলি** এবং **সন্ধিপুজো** দুর্গাপুজোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলির মধ্যে অন্যতম। অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত সন্ধিপুজোয় দেবী চামুণ্ডার রূপে পূজিত হন। এই সময় ১০৮টি প্রদীপ প্রজ্বলন এবং বিশেষ মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে দেবীর আরাধনা করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই শুভক্ষণ অত্যন্ত পবিত্র এবং ভক্তদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
এদিকে পুজোর নির্ঘণ্ট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন পুজো উদ্যোক্তা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি আরও জোরদার করেছেন। প্রতিমা নির্মাণ, আলোকসজ্জা, মণ্ডপসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন আয়োজকেরা। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, ভিড় সামলানো এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সামাজিক সম্প্রীতির অন্যতম প্রতীক। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে প্যান্ডেল পরিক্রমায় অংশ নেন। পাশাপাশি বিদেশ থেকেও বহু পর্যটক এই সময় বাংলায় আসেন। ইউনেস্কোর **Intangible Cultural Heritage**-এর স্বীকৃতি পাওয়ার পর কলকাতার দুর্গাপুজোর আন্তর্জাতিক গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, পূজার নির্ধারিত তিথি ও শুভক্ষণ মেনে আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার পাশাপাশি ভক্তিভাবই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই সময়সূচি মেনে পূজা করলেও উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দেবী দুর্গার আশীর্বাদ প্রার্থনা এবং সমাজে শান্তি, সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনা।
এদিকে ব্যবসায়ী মহলেও দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে উৎসাহ তুঙ্গে। পোশাক, গয়না, ইলেকট্রনিক্স, খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে পর্যটন—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই উৎসবকে ঘিরে বিশেষ অফার ও প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ফলে দুর্গাপুজো ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি বাংলার অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হয়।
সব মিলিয়ে, দুর্গাপুজোর পূর্ণ নির্ঘণ্ট প্রকাশের পর থেকেই উৎসবের কাউন্টডাউন কার্যত শুরু হয়ে গেছে। মহালয়া থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ তিথি, শুভক্ষণ এবং আচার-অনুষ্ঠানের সময় জেনে ভক্তরা ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি শুরু করেছেন। আশা করা হচ্ছে, এবারের দুর্গাপুজোও ধর্মীয় আচার, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং উৎসবের আবহে বাঙালির জীবনে নতুন আনন্দের বার্তা নিয়ে আসবে।


