সিঙ্গুরে রেলের জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত মামলায় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। সরকারি বা রেল প্রকল্পের জন্য অধিগৃহীত জমিতে বসবাসকারী বা ব্যবসা করা **ভাড়াটেরাও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী**—রেল মন্ত্রকের এই অবস্থান আদালতে স্পষ্ট হওয়ার পর মামলায় নতুন মোড় এসেছে। আদালত রাজ্য সরকারকে ক্ষতিপূরণের নির্দিষ্ট হিসাব জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার উপর স্থগিতাদেশ বহাল রেখেছে।
মামলার সূত্রপাত সিঙ্গুরে ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে। ডানকুনি থেকে লুধিয়ানা পর্যন্ত প্রায় ১,৮৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মালবাহী রেল করিডর নির্মাণের জন্য বহু বছর আগে জমি অধিগ্রহণ করা হয়। জমির মালিকদের আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও, সেই জমিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী এবং ব্যবসা পরিচালনাকারী কয়েকটি ভাড়াটিয়া পরিবার অভিযোগ করে যে তাদের কোনও ক্ষতিপূরণ না দিয়েই উচ্ছেদের নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এরপর আটটি ভাড়াটিয়া পরিবার কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়।
শুনানির সময় আবেদনকারীদের আইনজীবী আদালতে জানান, **২০১৩ সালের “Right to Fair Compensation and Transparency in Land Acquisition, Rehabilitation and Resettlement Act”** অনুযায়ী জমির মালিকের পাশাপাশি প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত ভাড়াটিয়া ও অন্যান্য প্রভাবিত ব্যক্তিরাও পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের অধিকারী। এই যুক্তির ভিত্তিতেই আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়।
মামলার শুনানিতে রেল মন্ত্রক আদালতের সামনে জানায় যে, প্রকল্পের জন্য অধিগৃহীত জমিতে বসবাসকারী বা ব্যবসা করা ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নীতিগত বিরোধিতা তাদের নেই। তবে তারা দাবি করে, ২০১৩ সালের আইনের আওতায় ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের ছিল। সেই পরিমাণ নির্ধারণ না হওয়ায় ক্ষতিপূরণ প্রদান প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। এই কারণেই দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি অমীমাংসিত অবস্থায় ছিল বলে রেলের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
রেল মন্ত্রকের এই অবস্থান নথিভুক্ত করার পর কলকাতা হাইকোর্ট নির্দেশ দেয় যে, **আগামী ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে** রাজ্য সরকারকে সংশ্লিষ্ট ভাড়াটিয়াদের ক্ষতিপূরণের নির্দিষ্ট হিসাব আদালতে জমা দিতে হবে। সেই সময় পর্যন্ত কোনও ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করা যাবে না বলেও আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে। আদালতের এই নির্দেশে আপাতত স্বস্তি পেয়েছেন মামলাকারী পরিবারগুলি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার গুরুত্ব শুধুমাত্র সিঙ্গুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতে সরকারি বা রেল প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়া, ব্যবসায়ী এবং অন্যান্য প্রকল্প-প্রভাবিত ব্যক্তিদের অধিকার নির্ধারণেও এই মামলার পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে পুনর্বাসন ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণের প্রশ্নে আদালতের এই অবস্থান ভবিষ্যতের একাধিক মামলায় প্রভাব ফেলতে পারে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, আদালত এখনও ক্ষতিপূরণের নির্দিষ্ট পরিমাণ ঘোষণা করেনি। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, রাজ্য সরকার প্রথমে ক্ষতিপূরণের হিসাব নির্ধারণ করে আদালতে জমা দেবে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী শুনানিতে আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। অর্থাৎ, বর্তমানে আদালত শুধু ভাড়াটিয়াদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার এবং উচ্ছেদের আগে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, কলকাতা হাইকোর্টের এই নির্দেশ রেলের জমিতে বসবাসকারী বহু ভাড়াটিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির বার্তা। প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করাই যে আইনের মূল লক্ষ্য, আদালতের এই পর্যবেক্ষণে সেই বার্তাই আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।


