মধ্যপ্রদেশের আজনার নদী পরিষ্কার করে ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে নজর কেড়েছিলেন তরুণ সুরেন্দ্র সিং চৌধরী, যিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘বিট্টু তাবাহি’ নামে পরিচিত। এবার তাঁর পরিবেশ সচেতনতার অভিযান পৌঁছে গেল দেশের রাজধানী দিল্লিতে। যমুনা নদীর দূষিত পাড় পরিষ্কারের কাজে হাত লাগালেন বিট্টু। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নিয়ে মাত্র সাড়ে চার ঘণ্টার অভিযানে যমুনার ঘাট থেকে প্রায় **৫৮৫ কেজি বর্জ্য** সরিয়ে ফেলেছেন তিনি। প্লাস্টিক, ফুল-মালা, পুজোর সামগ্রী-সহ নানা ধরনের আবর্জনা নদীর পাড়ে জমে ছিল। সেই বর্জ্য সরানোর ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ্যে আসতেই ফের প্রশংসায় ভাসছেন বিট্টু তাবাহি।
বিশ্ব পরিচ্ছন্নতা দিবস উপলক্ষে ২০ সেপ্টেম্বর থেকে দিল্লিতে তিন দিনের যমুনা পরিষ্কার অভিযান শুরু করেন বিট্টু। অভিযানের প্রথম দিনেই তাঁর সঙ্গে যোগ দেন একদল স্বেচ্ছাসেবী এবং স্থানীয় মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে যমুনার বিভিন্ন অংশে জমে থাকা আবর্জনা নিয়ে পরিবেশবিদদের উদ্বেগ রয়েছে। নদীর পাড়ে প্লাস্টিকের প্যাকেট, বোতল, ফুল, মালা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত নানা সামগ্রী জমে থাকার দৃশ্যও নতুন নয়। সেই জায়গাতেই নিজের দল নিয়ে সরাসরি পরিষ্কারের কাজে নেমে পড়েন বিট্টু।
অভিযানের সময় বিট্টু ও তাঁর সঙ্গীরা নদীর পাড়ে ছড়িয়ে থাকা আবর্জনা একে একে সংগ্রহ করেন। বর্জ্যের মধ্যে যেমন প্লাস্টিক ছিল, তেমনই ছিল পুজোর পর ফেলে দেওয়া ফুল, মালা এবং অন্যান্য ধর্মীয় সামগ্রী। কয়েক ঘণ্টা ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করার পর বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সরানো সম্ভব হয়। বিট্টুর হিসাব অনুযায়ী, সাড়ে চার ঘণ্টার সেই অভিযানে মোট ৫৮৫ কেজি আবর্জনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
এই অভিযানকে শুধু নদীর পাড় পরিষ্কারের একটি কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন না বিট্টু। তাঁর লক্ষ্য আরও বড়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে চান তিনি। তাঁর বক্তব্য, শুধু প্রশাসন বা পুরসভা কিংবা কোনও নির্দিষ্ট সংগঠনের উপর নির্ভর না করে সাধারণ মানুষও যদি নিজেদের আশপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নেন, তাহলে পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। সেই বার্তাই নিজের কাজের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে চাইছেন তিনি।
যমুনা পরিষ্কারের আগে মধ্যপ্রদেশের আজনার নদীকে ঘিরে বিট্টুর উদ্যোগ ভাইরাল হয়েছিল। নদীর বিভিন্ন অংশে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা আবর্জনা দেখে প্রশাসনের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই পরিষ্কারের কাজে নেমেছিলেন তিনি। প্লাস্টিক, বোতল, শ্যাওলা এবং অন্যান্য বর্জ্য সরিয়ে নদীর পাড় পরিষ্কার করার একাধিক ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেছিলেন। সেই ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিট্টু তাবাহি নামটি পরিচিত হয়ে ওঠে।
আজনার নদী পরিষ্কারের সময় বিট্টু নিজের পকেট থেকেও অর্থ খরচ করেছিলেন বলে পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর সেই উদ্যোগ পরিবেশপ্রেমীদের পাশাপাশি সাধারণ নেটিজেনদেরও নজর কাড়ে। নদী পরিষ্কারের মতো কাজের জন্য কোনও বড় পরিকাঠামো বা প্রচারের অপেক্ষা না করে একজন সাধারণ তরুণ কীভাবে নিজের উদ্যোগে কাজ শুরু করতে পারেন, বিট্টুর কর্মকাণ্ড তারই উদাহরণ হয়ে ওঠে।
আজনার নদীর সেই উদ্যোগের পর তাঁর কাজ আন্তর্জাতিক স্তরেও নজর কাড়ে। নেদারল্যান্ডসের পরিবেশ সংস্থা **The Ocean Cleanup**-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও বয়ান স্ল্যাটের কাছ থেকে কাজের প্রস্তাবও পান তিনি। ফলে একটি স্থানীয় নদী পরিষ্কারের উদ্যোগ ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংক্রান্ত আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।
তবে সেখানেই থেমে থাকেননি বিট্টু। বরং আজনারের পর দেশের অন্যান্য দূষিত জলাশয় ও নদীর দিকে নজর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর বর্তমান লক্ষ্য, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে গিয়ে পরিচ্ছন্নতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং সাধারণ মানুষকে নিজেদের পরিবেশ রক্ষায় সরাসরি যুক্ত করা। সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এবার দিল্লির যমুনা।
যমুনা নদী ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী হলেও দীর্ঘদিন ধরে দূষণের সমস্যায় জর্জরিত। বিশেষ করে দিল্লির অংশে নদীর জলে দূষণ এবং নদীর পাড়ে বর্জ্য জমে থাকা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পরেও সমস্যাটি পুরোপুরি দূর হয়নি। ফলে বিট্টু তাবাহির মতো ব্যক্তিগত উদ্যোগের মাধ্যমে ফের বিষয়টি জনসমক্ষে আসায় পরিবেশ সচেতনতার প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।
বিট্টুর যমুনা অভিযান অবশ্য শুধুমাত্র তাঁর একার উদ্যোগ ছিল না। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী এবং বাসিন্দারাও এই কাজে অংশ নেন। তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা ছাড়া এত বড় পরিমাণ বর্জ্য সরানো সম্ভব হত না। এই অংশগ্রহণই তাঁর অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ পরিবেশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব কেবল প্রশাসনের নয়, স্থানীয় মানুষেরও—এই বার্তাই কার্যত উঠে এসেছে এই অভিযানের মাধ্যমে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, বিট্টু ও তাঁর দলের সদস্যরা নদীর পাড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য সংগ্রহ করছেন। কাজ চলাকালীন স্থানীয় মানুষেরাও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। পরে সংগ্রহ করা বিপুল পরিমাণ বর্জ্য এক জায়গায় জড়ো করা হয়। ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর বহু মানুষ বিট্টুর উদ্যোগের প্রশংসা করেন। অনেকেই তাঁর এই অভিযানকে সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানোর কার্যকর উপায় হিসেবে দেখছেন।
বিট্টুর এই কাজের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি পরিচ্ছন্নতাকে শুধু একটি দিনের কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন না। তাঁর পরিকল্পনা দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা তৈরি করা। নদী পরিষ্কার করার পাশাপাশি মানুষ যাতে ভবিষ্যতে সেই নদী বা জলাশয়ে ফের আবর্জনা না ফেলেন, সেই মানসিকতা গড়ে তোলাই তাঁর বৃহত্তর উদ্দেশ্য।
যমুনার ক্ষেত্রেও সেই প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি নদীর পাড় একদিন পরিষ্কার করলেই যদি পরের দিন আবার সেখানে প্লাস্টিক, ফুল-মালা বা অন্যান্য বর্জ্য ফেলা হয়, তাহলে সেই পরিষ্কার অভিযান দীর্ঘস্থায়ী ফল দেবে না। তাই বিট্টুর মতো ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনা জরুরি। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা দৈনন্দিন জীবনের বর্জ্য নদীতে না ফেলার অভ্যাস তৈরি করা গেলে নদী দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশেষ করে পুজোর ফুল, মালা এবং ধর্মীয় সামগ্রী নদীতে ফেলার প্রবণতা বহু জায়গাতেই দেখা যায়। এগুলি প্রাকৃতিক বলে মনে হলেও বিপুল পরিমাণে নদীতে জমলে জলদূষণের সমস্যা তৈরি করতে পারে। এর সঙ্গে প্লাস্টিক যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। বিট্টুর যমুনা পরিষ্কার অভিযানে এই দুই ধরনের বর্জ্যই বড় পরিমাণে পাওয়া গিয়েছে বলে তাঁর প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়।
দিল্লিতে তাঁর তিন দিনের অভিযান এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। প্রথম দিনের কাজেই ৫৮৫ কেজি বর্জ্য সরানো হয়েছে। অর্থাৎ পরবর্তী দিনগুলিতেও আরও বর্জ্য সংগ্রহ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিট্টুর পরবর্তী গন্তব্য হিসেবে গুরুগ্রামের খেরকি দৌলার নামও সামনে এসেছে। সেখানে পরবর্তী পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
যমুনা পরিষ্কারের এই উদ্যোগের পিছনে সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেছেন বিট্টু। তাঁর পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত ভিডিওগুলি বিভিন্ন মানুষের নজরে আসার পর পরিবেশ নিয়ে তাঁর কাজ আরও বড় পরিসরে পৌঁছেছে। দিল্লির অভিযানেও স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি সহযোগীদের ভূমিকা রয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত উদ্যোগ কীভাবে ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রচারে পরিণত হতে পারে, বিট্টুর বর্তমান অভিযান তার একটি উদাহরণ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় বিট্টুর জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ হল তাঁর কাজের সরাসরি ধরন। পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে শুধু বক্তব্য না রেখে তিনি নিজেই হাতে-কলমে নদীর পাড়ে নেমে কাজ করেন। আবর্জনা সরানো, প্লাস্টিক সংগ্রহ করা কিংবা নদীর পাড় পরিষ্কার করার মতো কাজ নিজের হাতে করে দেখান। ফলে তাঁর ভিডিওগুলি কেবল বিনোদনমূলক কনটেন্ট নয়, অনেকের কাছে সচেতনতার বার্তাও বহন করছে।
বিট্টুর এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন সোশ্যাল মিডিয়ার বহু ব্যবহারকারী। তাঁর আগের আজনার নদী পরিষ্কারের কাজও শিল্পপতি আনন্দ মাহিন্দ্রার মতো পরিচিত ব্যক্তিদের নজরে এসেছিল। ফলে তাঁর কাজের প্রচার আরও বিস্তৃত হয়েছে। এবার যমুনা পরিষ্কার অভিযানের ভিডিওও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় তাঁর পরিবেশ সচেতনতার প্রচার আরও বড় সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
তবে নদী পরিষ্কারের মতো বড় সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র ব্যক্তিগত উদ্যোগে সম্ভব নয়। নদী দূষণ কমাতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় মানুষের সচেতনতা এবং নিয়মিত নজরদারি—সবকিছুর প্রয়োজন। বিট্টুর অভিযান সেই বৃহত্তর সমস্যার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। তাঁর কাজ যদি আরও মানুষকে নদী বা জলাশয়ে বর্জ্য না ফেলার বিষয়ে সচেতন করে, তাহলে এই উদ্যোগের বাস্তব প্রভাব আরও বড় হতে পারে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রদেশের আজনার নদী থেকে শুরু হওয়া ‘বিট্টু তাবাহি’-র পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবার পৌঁছে গেল দিল্লির যমুনায়। বিশ্ব পরিচ্ছন্নতা দিবস উপলক্ষে শুরু হওয়া তিন দিনের কর্মসূচির প্রথম দিনেই স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নিয়ে সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে কাজ করে **৫৮৫ কেজি বর্জ্য** সরিয়েছেন সুরেন্দ্র সিং চৌধরী। প্লাস্টিক থেকে ফুল-মালা, পুজোর সামগ্রী—নদীর পাড়ে জমে থাকা নানা ধরনের আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়েছে। আগামী দিনে তাঁর অভিযান দেশের আরও বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যমুনার পর তাঁর পরবর্তী গন্তব্য গুরুগ্রামের খেরকি দৌলা। ফলে একজন তরুণের ব্যক্তিগত উদ্যোগ এখন ধীরে ধীরে দেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সচেতনতার একটি বৃহত্তর বার্তায় পরিণত হচ্ছে।


