জাতীয় ক্রীড়া দিবসের অনুষ্ঠানে বাংলার ক্রীড়াক্ষেত্র নিয়ে একাধিক বড় ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার নবান্নে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাজ্যের ক্রীড়া পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানান তিনি। একইসঙ্গে চলতি বছরেই ১০০টি মিনি ইনডোর স্টেডিয়াম তৈরি করার পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেন। পাশাপাশি গত বছর কলকাতায় লিয়োনেল মেসির অনুষ্ঠান ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের প্রসঙ্গ তুলে টিকিট কিনেও সমস্যায় পড়া প্রায় ৩৩ হাজার দর্শকের টাকা ফেরানোর উদ্যোগ শুরু হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
মেজর ধ্যানচাঁদের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দেশজুড়ে পালিত হয় জাতীয় ক্রীড়া দিবস। সেই উপলক্ষেই নবান্নে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। অনুষ্ঠানে কৃতী ক্রীড়াবিদদের সম্মান জানানো হয় এবং কয়েকজনকে সরকারি চাকরির নিয়োগপত্রও দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন হকি খেলোয়াড় গুরুবক্স সিং, রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ এবং সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কল্যাণ চৌবের মতো ব্যক্তিত্বরা। সেখানেই রাজ্যের ক্রীড়াক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নিজের বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুভেন্দু অধিকারী জানান, রাজ্যের ক্রীড়াক্ষেত্রের জন্য ৪০০ কোটি টাকার বাজেট ধরা হয়েছে। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ এক বছরের বাজেট নয়; আট মাসের সময়সীমার জন্য এই বরাদ্দ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্যে ক্রীড়া পরিকাঠামোর উন্নয়নকে আরও পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই এই অর্থ বরাদ্দ করা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল রাজ্যের বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রে মিনি ইনডোর স্টেডিয়াম তৈরি। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রেই এমন পরিকাঠামো তৈরি করা হবে। প্রতিটি স্টেডিয়ামে টেনিস ও ব্যাডমিন্টন কোর্টের পাশাপাশি জিমের মতো সুবিধা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে একসঙ্গে ২৯৪টি স্টেডিয়াম তৈরি করা সম্ভব নয় বলে চলতি বছর প্রথম ধাপে ১০০টি মিনি ইনডোর স্টেডিয়াম তৈরির লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে।
শুধু নতুন স্টেডিয়াম তৈরি নয়, রাজ্যে ইতিমধ্যে থাকা ক্রীড়া পরিকাঠামোর সংস্কারের উপরও জোর দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকারের সময়ে ক্রীড়াক্ষেত্রে যথেষ্ট অবহেলা হয়েছে এবং বেশ কিছু ক্রীড়া পরিকাঠামো বর্তমানে দুর্বল বা ভগ্নপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। সেই সমস্ত জায়গাকে নতুন করে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। পুরনো স্টেডিয়ামগুলির সংস্কার এবং বিভিন্ন স্তরের ক্রীড়া সংস্থাকে সক্রিয় করার বিষয়টিও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।
বাংলার ক্রীড়া প্রতিভা নিয়ে নিজের বক্তব্যে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, রাজ্যে প্রতিভার অভাব নেই। তরুণ-তরুণীদের মধ্যে মেধা, দক্ষতা, পরিশ্রম এবং একাগ্রতা রয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিভাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকাঠামো এবং সংগঠিত ব্যবস্থা। তাঁর মতে, শুধু প্রতিভা থাকলেই হবে না, সেই প্রতিভাকে বিকশিত করার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, সুযোগ এবং উপযুক্ত ক্রীড়া পরিবেশ।
ক্রীড়া সংস্থাগুলির পরিচালনা নিয়েও নিজের মতামত জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, প্রতিটি খেলাধুলা বা ক্রীড়া সংস্থার উপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত নয়। ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। নতুন সরকারের আমলে সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি।
এরপরই লিয়োনেল মেসিকে ঘিরে গত বছরের বিতর্কের প্রসঙ্গ ওঠে। ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে এসেছিলেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী তারকা লিয়োনেল মেসি। তাঁকে এক ঝলক দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ কলকাতায় এসেছিলেন। অনেক দর্শক কয়েক হাজার টাকা খরচ করে টিকিট কিনেছিলেন। কিন্তু অনুষ্ঠান ঘিরে বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ায় বহু দর্শক মেসিকে প্রত্যাশিতভাবে দেখতে পারেননি। এরপরই টিকিটের টাকা ফেরতের দাবি জোরালো হয়।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে তৎকালীন রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয় এবং আইনি প্রক্রিয়াও এগোয়। মেসি-অনুষ্ঠানের আয়োজক শতদ্রু দত্ত তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগও দায়ের করেছেন বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা যায়।
এবার সেই বিতর্কের প্রসঙ্গেই নতুন করে টিকিটের টাকা ফেরানোর কথা জানিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, প্রায় ৩৩ হাজার ক্রীড়াপ্রেমী মেসিকে দেখার জন্য টিকিট কিনেছিলেন। টিকিটের দাম ছিল কয়েক হাজার টাকা—প্রতিবেদন অনুযায়ী ₹৪,০০০ এবং ₹৬,০০০ মূল্যের টিকিটের কথাও উল্লেখ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই দর্শকদের টাকা কীভাবে ফেরানো যায়, তা নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে কবে এবং কী পদ্ধতিতে এই টাকা ফেরত দেওয়া হবে, তার নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনও ঘোষণা করা হয়নি। প্রশাসনিক ও আইনি দিকগুলি খতিয়ে দেখেই পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে বলে জানা যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে টাকা ফেরতের অপেক্ষায় থাকা দর্শকদের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য নতুন আশার বার্তা দিয়েছে।
মেসি-কাণ্ডের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের ‘খেলো ইন্ডিয়া’ প্রকল্প থেকেও আরও অর্থ পাওয়ার চেষ্টা করছে রাজ্য সরকার। ক্রীড়া পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ১০০ কোটি টাকার প্রতিশ্রুতির কথা জানা গিয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বড় অঙ্কের অর্থ কেন্দ্রের কাছ থেকে পাওয়ার চেষ্টা করা হবে বলেও মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন।
রাজ্যের জাতীয় স্তরের ক্লাবগুলিকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি জীর্ণ অবস্থায় থাকা স্টেডিয়াম এবং অচল হয়ে পড়া বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থাকে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর ফলে একদিকে নতুন পরিকাঠামো তৈরি হবে, অন্যদিকে পুরনো সম্পদগুলিও কাজে লাগানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার।
সব মিলিয়ে জাতীয় ক্রীড়া দিবসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষণায় বাংলার ক্রীড়াক্ষেত্র নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। একদিকে ৪০০ কোটি টাকার ক্রীড়া বাজেট এবং ১০০টি মিনি ইনডোর স্টেডিয়াম তৈরির পরিকল্পনা, অন্যদিকে মেসি-কাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত দর্শকদের টিকিটের টাকা ফেরানোর উদ্যোগ—দুটি বিষয়ই এখন বিশেষ আলোচনায়। তবে ঘোষণাগুলি বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয় এবং মেসি অনুষ্ঠানের দর্শকরা কবে টাকা হাতে পান, সেটাই এখন দেখার বিষয়।


