বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে Transfer of Property (Amendment) Act, 2026, যা সম্পত্তি হস্তান্তরের নিয়মে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। নতুন আইনের মাধ্যমে বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, সন্তান-সন্ততি বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি উপহার হিসেবে হস্তান্তর করার পরও দাতা তাঁর জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তিতে বসবাস বা ভোগদখলের অধিকার ধরে রাখতে পারবেন। সরকার এই সংশোধনকে প্রবীণদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলে দাবি করলেও, বিরোধী রাজনৈতিক দল ও ইসলামপন্থী সংগঠনগুলির একাংশ এর বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে এমন বহু অভিযোগ সামনে এসেছে, যেখানে বাবা-মা জীবদ্দশায় সন্তানদের নামে বাড়ি বা জমি লিখে দেওয়ার পর নিজেরাই সেই সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সরকার বলছে, বিদ্যমান আইনে এই পরিস্থিতিতে দাতার অধিকার রক্ষার স্পষ্ট বিধান ছিল না। সেই শূন্যতা পূরণ করতেই নতুন সংশোধনী আনা হয়েছে।
### নতুন আইনে কী পরিবর্তন হলো?
সংশোধিত আইনে Section 122A ও Section 122B নামে নতুন বিধান যুক্ত হয়েছে। এর ফলে কোনও ব্যক্তি যদি নিজের বাড়ি বা জমি ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি কিংবা স্বামী বা স্ত্রীর নামে উপহার দেন, তাহলে মালিকানা সঙ্গে সঙ্গে হস্তান্তরিত হলেও দাতা তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার আইনগতভাবে সংরক্ষণ করতে পারবেন।
আইনে আরও বলা হয়েছে, সম্পত্তির প্রাপক যদি দাতার জীবদ্দশায় মারা যান, তাহলেও দাতার ভোগদখলের অধিকার বহাল থাকবে। পরবর্তীতে প্রাপকের উত্তরাধিকারীদের কাছে সম্পত্তির মালিকানা আইনি নিয়ম অনুযায়ী যাবে।
### সরকারের যুক্তি কী?
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সংসদে বিল উপস্থাপনের সময় বলেন, এটি একটি “স্বতন্ত্র সম্পত্তি হস্তান্তর ব্যবস্থা” তৈরি করছে। তাঁর দাবি, এর উদ্দেশ্য প্রবীণ বাবা-মা বা পরিবারের দুর্বল সদস্যদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া। তিনি আরও বলেন, এই ব্যবস্থা বিদ্যমান উপহার (Gift) প্রথা বা মুসলিম আইনের হেবা (Hiba) ব্যবস্থাকে বাতিল করছে না; বরং এটি একটি বিকল্প দেওয়ানি ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন আইন সব ধর্মের মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য এবং এটি কোনও ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনকে সরাসরি পরিবর্তন করছে না।
### কেন বিতর্ক?
সংসদে বিল পাস হওয়ার সময় বিরোধী দলগুলির পক্ষ থেকে আপত্তি তোলা হয়। বিরোধী নেতা শফিকুর রহমান যুক্তি দেন, আইনের উদ্দেশ্য ভালো হলেও এটি শরিয়তের সম্পত্তি হস্তান্তর ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাঁর প্রশ্ন ছিল, “আমরা কি কোরআনের মৌলিক নীতি অনুসরণ করব, নাকি সেটিকে উপেক্ষা করব?”
সংসদের বাইরে ইসলামপন্থী সংগঠনগুলিও এই আইন প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। তাদের অভিযোগ, নতুন বিধান মুসলিম সম্পত্তি আইনের প্রচলিত ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
### বিশেষজ্ঞদের মত
আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একাংশের মতে, এই আইন প্রবীণ মানুষদের জন্য বাস্তবিক সুরক্ষা দিতে পারে, কারণ অনেকেই সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর বাসস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন।
অন্যদিকে, কিছু আইনবিদের মতে, আইনটি উপকারী হলেও এটি সব সমস্যার সমাধান নয়। তাদের যুক্তি, পরিবারে জোরপূর্বক সম্পত্তি লিখিয়ে নেওয়া, প্রবীণদের ওপর নির্যাতন বা আর্থিক নির্ভরতার মতো সমস্যাগুলি কেবল সম্পত্তি আইনের পরিবর্তনে পুরোপুরি দূর হবে না। এছাড়া ধর্মীয় আইন ও দেওয়ানি আইনের সম্পর্ক নিয়েও আদালতে ভবিষ্যতে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে।
### বাস্তবে কী প্রভাব পড়তে পারে?
নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর একজন বাবা তাঁর বাড়ির মালিকানা ছেলের নামে লিখে দিয়েও আইনগতভাবে সেই বাড়িতে আজীবন থাকার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। একই সুবিধা স্বামী-স্ত্রী এবং দাদা-দাদি বা নানা-নানি ও নাতি-নাতনির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। ফলে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর দাতার নিরাপত্তা বাড়তে পারে বলে সরকারের আশা।
তবে এই সংশোধনীকে ঘিরে ধর্মীয়, আইনি ও সামাজিক বিতর্ক এখনও থামেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে আদালতের ব্যাখ্যা এবং বাস্তব প্রয়োগই নির্ধারণ করবে নতুন আইনটি কতটা কার্যকর হয়।


