ফের বড়সড় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মুখে বাংলাদেশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার বিদ্যুৎ ব্যবহারে আরও কড়া নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটল বাংলাদেশ সরকার। নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, দেশের শপিং মল, মার্কেট এবং দোকানপাট নির্দিষ্ট সময়ের পর আর খোলা রাখা যাবে না। এখন থেকে সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্তই এই সমস্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান চালু রাখার অনুমতি রয়েছে। অর্থাৎ আগের তুলনায় এক ঘণ্টা আগেই দোকানপাট বন্ধ করতে হবে।
শুধু দোকান বা শপিং মলের সময় কমানো নয়, বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড এবং সাজসজ্জার আলোর ক্ষেত্রেও একাধিক বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হল সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের চাহিদা কমিয়ে জাতীয় গ্রিডের উপর চাপ কিছুটা হ্রাস করা।
## রাত ৮টার পর বন্ধ থাকবে দোকান, মার্কেট
বাংলাদেশের Power Division-এর নির্দেশ অনুযায়ী, দোকান, মার্কেট এবং শপিং মলগুলির নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। এর আগে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলি রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার অনুমতি পেত। নতুন নির্দেশ কার্যকর হওয়ার ফলে ব্যবসায়ীদের প্রতিদিন এক ঘণ্টা আগে দোকান বন্ধ করতে হবে।
এই সিদ্ধান্ত মূলত বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যার পর দোকানপাটে আলো, এয়ার কন্ডিশনার, সাইনবোর্ড এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহার বেড়ে যায়। ফলে দিনের শেষভাগে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ে। সেই সময় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ করে দেওয়া হলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রশাসন।
## সন্ধ্যা ৭টার মধ্যেই বন্ধ করতে হবে বিলবোর্ডের আলো
দোকানপাট বন্ধ করার সময় কমানোর পাশাপাশি বিজ্ঞাপনী আলোর ব্যবহারেও নিয়ন্ত্রণ আনা হয়েছে। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী, সমস্ত আলোকিত বিলবোর্ডের আলো সন্ধ্যা ৭টার মধ্যেই বন্ধ করতে হবে। একইসঙ্গে দোকান, মার্কেট ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় সাজসজ্জার আলো জ্বালানোও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের সময়ে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জাকে বাড়তি বিদ্যুৎ খরচ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাই জরুরি নয় এমন আলো বন্ধ রাখার মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের চেষ্টা করছে বাংলাদেশ সরকার। এর ফলে সন্ধ্যার পর দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকা আগের তুলনায় অনেকটাই অন্ধকার হয়ে যেতে পারে।
## মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও সময়সীমা
নতুন বিধিনিষেধের আওতা শুধুমাত্র দোকানপাট বা শপিং মলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চলমান এবং পরবর্তী সময়ে আয়োজিত বিভিন্ন মেলা, বাণিজ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্দেশ অনুযায়ী, এই ধরনের অনুষ্ঠান রাত ৮টার মধ্যে শেষ করার ব্যবস্থা করতে হবে।
এর ফলে সন্ধ্যার পর দীর্ঘ সময় ধরে আলো জ্বালিয়ে মেলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চালানোর সুযোগ কমবে। সরকারের লক্ষ্য হল দিনের আলোকে যতটা সম্ভব কাজে লাগানো এবং সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের ব্যবহার সীমিত রাখা।
## কেন এতটা কড়া পদক্ষেপ বাংলাদেশে?
বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে গ্যাসের সরবরাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার বড় একটি অংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় গ্যাসের ঘাটতি সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। একইসঙ্গে আমদানি করা LNG-এর সরবরাহ ও খরচ নিয়েও চাপ রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিংয়ের খবর সামনে এসেছে। কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট কয়েক ঘণ্টা ধরে স্থায়ী হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। Reuters-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে গ্যাসের ঘাটতি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে তার প্রভাবের কথাও উঠে এসেছে।
## চাহিদা বাড়লেও বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ
বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা বর্তমানে প্রায় ১৮,০০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সরবরাহ সেই মাত্রায় পৌঁছতে না পারায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। ফলে বিশেষ করে পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলির সন্ধ্যার পরের বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দোকানপাট এবং শপিং মল বন্ধ হয়ে গেলে আলো, এসি, লিফট, সাইনবোর্ডসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহারও কমবে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডের উপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।
## ভারতের কাছে অতিরিক্ত ডিজেলের আবেদন
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মধ্যেই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনারের বৈঠকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংক্রান্ত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিজেলের জোগান বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবহণ এবং বিভিন্ন জরুরি পরিষেবার ক্ষেত্রেও জ্বালানি প্রয়োজন। তাই দেশের অভ্যন্তরীণ ঘাটতি সামাল দিতে প্রতিবেশী দেশগুলির সহযোগিতার দিকেও নজর দিচ্ছে ঢাকা।
## সাধারণ মানুষের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
দোকান ও মার্কেট রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়বে ব্যবসায়ী এবং ক্রেতাদের উপর। বিশেষ করে যাঁরা অফিস বা কাজ শেষ করে সন্ধ্যার পর বাজার করতে যান, তাঁদের হাতে কেনাকাটার সময় কমে যাবে। একইসঙ্গে রাতের ব্যবসার উপর নির্ভরশীল ছোট দোকান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলিও আর্থিকভাবে কিছুটা চাপে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও সমস্যা বাড়তে পারে। বাড়িতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার পাশাপাশি ব্যবসা, শিল্প এবং পরিষেবা ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সরকারি নির্দেশকে আপাতত সংকট মোকাবিলার একটি জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
## কবে পর্যন্ত চলবে এই বিধিনিষেধ?
এই নতুন সময়সীমা কতদিন কার্যকর থাকবে, তা নির্ভর করবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতির উপর। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরবর্তী সময়ে দোকান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সময়সীমা নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তবে আপাতত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করাই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট পরিস্থিতি যে যথেষ্ট গুরুতর, নতুন এই সিদ্ধান্ত তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাত ৯টার পরিবর্তে রাত ৮টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বিলবোর্ডের আলো নিভিয়ে দেওয়া এবং মেলা-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সময়সীমা কমানোর মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং গ্যাস সরবরাহের সমস্যার মোকাবিলায় অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে বাংলাদেশ।


