প্রায় ১৯ বছর পর পর্দায় ফিরেছে ‘আওয়ারাপন’-এর সেই পরিচিত আবেগ, অন্ধকার আর অসম্পূর্ণ ভালোবাসার জগৎ। ইমরান হাশমিকে আবারও শিবম পণ্ডিতের চরিত্রে দেখা যাচ্ছে ‘আওয়ারাপন ২’-এ। ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আওয়ারাপন’ বক্স অফিসে প্রত্যাশিত সাফল্য না পেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছবিটি একটি কাল্ট মর্যাদা অর্জন করে। তার আবেগঘন গল্প, ইমরানের সংযত অভিনয় এবং গান ছবিটিকে দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে দেয়। সেই জনপ্রিয়তার উত্তরাধিকার নিয়েই তৈরি হয়েছে দ্বিতীয় পর্ব। ১৪ আগস্ট ২০২৬ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া ‘আওয়ারাপন ২’ তাই শুধুমাত্র একটি সিক্যুয়েল নয়, পুরনো দর্শকদের জন্য এক টুকরো নস্টালজিয়াও।
প্রথমেই বলতে হয়, ছবিটির সবচেয়ে বড় শক্তি ইমরান হাশমি। শিবম পণ্ডিতের চরিত্রে তাঁর প্রত্যাবর্তনই ‘আওয়ারাপন ২’-এর মূল আকর্ষণ। দীর্ঘ সময় পর সেই পরিচিত বিষণ্ণ, কঠিন এবং আবেগকে ভিতরে চেপে রাখা মানুষটিকে পর্দায় ফিরিয়ে এনেছেন অভিনেতা। তাঁর অভিনয়ে অতীতের চরিত্রটির সঙ্গে বর্তমানের শিবমের যোগসূত্র যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে বয়স ও অভিজ্ঞতার ছাপ। ফলে চরিত্রটিকে শুধুমাত্র পুরনো আবেগের পুনরাবৃত্তি মনে হয় না। বরং শিবম যেন আরও পরিণত, আরও ক্লান্ত এবং নিজের অতীতের ভারে আরও ভারাক্রান্ত।
‘আওয়ারাপন’-এর সাফল্যের পিছনে গল্পের পাশাপাশি ইমরানের অভিনয় এবং সঙ্গীতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। দ্বিতীয় পর্বেও নির্মাতারা সেই আবেগঘন পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। ছবিতে অ্যাকশন, প্রতিশোধ, ভালোবাসা এবং আত্মত্যাগের পাশাপাশি রয়েছে একজন মানুষের নিজের সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প। ফলে এটি শুধুমাত্র একটি অ্যাকশন থ্রিলার হয়ে থাকেনি; চরিত্রগুলির মানসিক টানাপোড়েনও গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক দর্শক প্রতিক্রিয়াতেও ইমরানের অভিনয়, অ্যাকশন দৃশ্য এবং আবেগঘন মুহূর্তগুলির প্রশংসা দেখা যাচ্ছে।
তবে ‘আওয়ারাপন ২’-এর সামনে শুরু থেকেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রথম ছবিটি সময়ের সঙ্গে কাল্ট হয়ে ওঠায় দ্বিতীয় পর্বের প্রত্যাশা ছিল অত্যন্ত বেশি। নতুন গল্পকে পুরনো ছবির আবেগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ কাজ নয়। এই জায়গায় ছবিটি কিছু ক্ষেত্রে সফল হলেও পুরোপুরি নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারেনি। কিছু সমালোচকের মতে, গল্পের কয়েকটি বাঁক অনুমান করা যায় এবং ছবির কিছু অংশ অতীতের নস্টালজিয়ার উপর যথেষ্ট নির্ভরশীল।
তবু পরিচালক নীতিন কক্কর ছবিটিকে শুধুমাত্র পুরনো ছবির পুনরাবৃত্তি না করে একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। শিবমের জীবনে নতুন পরিস্থিতি, নতুন সম্পর্ক এবং নতুন সংঘাত যোগ করা হয়েছে। প্রতিশোধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবেগ এবং redemption-এর বিষয়। ফলে চরিত্রটির মানসিক পরিবর্তনও গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ছবির বিস্তৃত ভিজ্যুয়াল ক্যানভাস এবং অ্যাকশন দৃশ্যগুলিও আগের ছবির তুলনায় বড় পরিসর তৈরি করেছে।
দিশা পাটানির উপস্থিতিও ছবির গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাঁর চরিত্র গল্পে নতুন আবেগ এবং সংঘাতের মাত্রা যোগ করেছে। ইমরান ও দিশার জুটি ছবির আবেগঘন অংশগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তবে ছবির কেন্দ্রবিন্দু শেষ পর্যন্ত শিবম এবং তাঁর অতীতই। দিশার চরিত্র সেই জগতকে আরও বিস্তৃত করার কাজ করেছে।
শাবানা আজমির মতো অভিজ্ঞ অভিনেত্রীর উপস্থিতিও ছবিতে আলাদা গুরুত্ব তৈরি করেছে। তাঁর অভিনয় গল্পের আবেগ এবং চরিত্রগুলির সম্পর্ককে আরও গভীরতা দিয়েছে। একইসঙ্গে সুউইন্দর ভিকির অভিনয়ও নজর কেড়েছে। অভিনেতা নিজেই জানিয়েছেন, ‘আওয়ারাপন ২’-এর মতো একটি কাল্ট ছবির সিক্যুয়েলের অংশ হওয়া স্বাভাবিকভাবেই চাপের। তাঁর চরিত্রের পর্দায় উপস্থিতি খুব বেশি সময়ের না হলেও গল্পে তার গুরুত্ব রয়েছে।
ছবিটির সঙ্গীত নিয়েও বিশেষ প্রত্যাশা ছিল। ‘আওয়ারাপন’-এর গান আজও দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন। তাই দ্বিতীয় পর্বে গানকে ঘিরে প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। বিশেষ করে অরিজিৎ সিংয়ের কণ্ঠে ‘ইয়ে আওয়ারাপন’ গানটি মুক্তির আগেই যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি করেছিল। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র শিবম পণ্ডিতের আবেগঘন দিককে মাথায় রেখে গানটি তৈরি করা হয়েছে বলে জানা যায়। ইমরান হাশমির সঙ্গে অরিজিতের এই পুনর্মিলনও ছবির সঙ্গীতের ক্ষেত্রে বড় আকর্ষণ।
‘আওয়ারাপন ২’-এর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরও ছবির আবহ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। দর্শকদের একটি অংশ বিশেষভাবে ছবির আবহসঙ্গীত এবং অ্যাকশন দৃশ্যের প্রশংসা করেছেন। অ্যাকশনের পাশাপাশি যখন গল্প আবেগের দিকে মোড় নেয়, তখন সঙ্গীত সেই মুহূর্তগুলিকে আরও তীব্র করে তোলে। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে শিবমের চরিত্রের আবেগঘন উপস্থিতি ছবির অন্যতম শক্তিশালী দিক হিসেবে উঠে এসেছে।
চিত্রগ্রহণের ক্ষেত্রেও ছবিটি আগের পর্বের অন্ধকার ও বিষণ্ণ আবহ ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। আলো-আঁধারির ব্যবহার, অ্যাকশন দৃশ্যের নির্মাণ এবং চরিত্রগুলির আবেগকে ফ্রেমে ধরে রাখার পদ্ধতি ছবিটিকে একটি নির্দিষ্ট ভিজ্যুয়াল পরিচয় দিয়েছে। বড় পর্দায় ছবিটি দেখার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষভাবে কার্যকর।
তবে ছবির দুর্বলতাও রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল গল্পের কিছু অংশ অত্যন্ত পরিচিত মনে হতে পারে। যাঁরা প্রথম ‘আওয়ারাপন’-এর আবেগ এবং গল্পের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, তাঁদের কাছে দ্বিতীয় পর্বের কিছু মুহূর্ত প্রত্যাশার তুলনায় কম চমকপ্রদ মনে হতে পারে। বিশেষ করে যেখানে একটি সিক্যুয়েল নতুন গল্প এবং নতুন অভিজ্ঞতা দেওয়ার কথা, সেখানে নস্টালজিয়ার উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কিছু জায়গায় ছবির মৌলিকতাকে সীমিত করেছে। একটি সমালোচনায় ছবিটিকে একবার দেখার মতো অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং গল্পের পরিচিত কাঠামোকে এর অন্যতম দুর্বলতা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে বেশি ইতিবাচক। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক দর্শক ইমরানের প্রত্যাবর্তনকে ছবির প্রধান আকর্ষণ হিসেবে দেখেছেন। কেউ ছবির আবেগঘন দৃশ্যের প্রশংসা করেছেন, কেউ অ্যাকশন ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের। আবার অনেকে মনে করছেন, ‘আওয়ারাপন ২’ মূল ছবির অনুরাগীদের জন্য এক ধরনের fan service হিসেবে কাজ করেছে।
ছবিটির মুক্তির আগেই বক্স অফিসে দর্শকদের আগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। স্বাধীনতা দিবসের সপ্তাহান্তে মুক্তি পাওয়ায় ছবিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ছুটির সুবিধাও পেয়েছে। অগ্রিম বুকিংয়ের ক্ষেত্রে ‘আওয়ারাপন ২’ শুরুতেই শক্তিশালী সাড়া পেয়েছিল এবং একই দিনে মুক্তি পাওয়া ‘বাঁটওয়ারা ১৯৪৭’-এর তুলনায় এগিয়ে ছিল।
সবশেষে বলা যায়, ‘আওয়ারাপন ২’ নিখুঁত ছবি না হলেও ইমরান হাশমির জন্য এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাবর্তন। শিবম পণ্ডিতের চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছবিটিকে আবেগের জায়গা থেকে শক্তিশালী করেছে। গল্পে কিছু অনুমানযোগ্য মোড় এবং নস্টালজিয়ার উপর নির্ভরতা থাকলেও অ্যাকশন, সঙ্গীত, আবেগ এবং ইমরানের উপস্থিতি ছবিটিকে একবার দেখার মতো করে তুলেছে।
যাঁরা ২০০৭ সালের ‘আওয়ারাপন’-এর ভক্ত, তাঁদের কাছে এই ছবি মূলত পুরনো স্মৃতিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ। আর নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে এটি হতে পারে ইমরান হাশমির অভিনয়ের একটি আবেগঘন অ্যাকশন ড্রামা। শিবম পণ্ডিতের প্রত্যাবর্তন কতটা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। তবে প্রথম দিনের প্রতিক্রিয়া অন্তত এটুকু স্পষ্ট করছে—১৯ বছর পরেও ‘আওয়ারাপন’-এর সেই আবেগ দর্শকের মনে পুরোপুরি মুছে যায়নি।


