দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির রাজনীতিতে তৈরি হল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। পূর্ব জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেল অতি-ডানপন্থী দল **Alternative for Germany বা AfD**। প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে রাজ্যের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে দলটি। এই ফলাফলকে জার্মানির যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে বিপুল ভোট পেলেও এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি AfD। ৮৩ আসনের রাজ্য বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৪২টি আসন। AfD পেয়েছে ৩৯টি আসন। ফলে সরকার গঠন করতে হলে অন্য দলের সমর্থন বা কোনও ধরনের সমঝোতার প্রয়োজন হবে।
### প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট, বড় ধাক্কা CDU-র
নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক শুধু AfD-র জয় নয়, বরং চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎসের দল **CDU-র বিপর্যয়কর ফল**। AfD যেখানে প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে, সেখানে CDU-র ভোট নেমে এসেছে প্রায় ১৭–১৮ শতাংশে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে স্যাক্সনি-আনহাল্টের রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থানে থাকা রক্ষণশীল দলটি এবার বড় ধাক্কা খেল।
২০২১ সালের নির্বাচনে CDU ছিল রাজ্যের সবচেয়ে বড় দল এবং প্রায় ৩৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। সেই তুলনায় এবার তাদের ভোটব্যাঙ্কের পতন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একই সময়ে ২০২১ সালে প্রায় ২১ শতাংশ ভোট পাওয়া AfD এবার দ্বিগুণেরও বেশি সমর্থন পেয়েছে।
### উলরিখ জিগমুন্ডের নেতৃত্বে AfD-র উত্থান
স্যাক্সনি-আনহাল্টে AfD-র প্রচারের নেতৃত্বে ছিলেন ৩৫ বছর বয়সি **উলরিখ জিগমুন্ড**। নির্বাচনী প্রচারে অভিবাসন, নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং জার্মানির ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষকে সামনে আনেন তিনি।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর জিগমুন্ড বলেন, ভোটাররা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে বর্তমান পরিস্থিতি আর এভাবে চলতে পারে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষ রাজনৈতিক পরিবর্তন চাইছেন।
তবে জিগমুন্ডের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। AfD-র স্যাক্সনি-আনহাল্ট শাখাকে জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা চরমপন্থী সংগঠন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। দলের অভিবাসন-বিরোধী অবস্থান এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নীতির কারণেও দলটি দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।
### অভিবাসন নীতিই কি AfD-র বড় অস্ত্র?
AfD-র নির্বাচনী সাফল্যের অন্যতম কারণ হিসেবে অভিবাসন ইস্যুকে সামনে রাখা হচ্ছে। দলটি জার্মানিতে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার পক্ষে। আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে কড়া নীতি এবং বেআইনি অভিবাসীদের দ্রুত ফেরত পাঠানোর মতো বিষয় তাদের প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার খরচ, জার্মানির বর্তমান সরকারের প্রতি অসন্তোষ এবং পূর্ব জার্মানির বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হতাশাও AfD-র ভোট বৃদ্ধির পিছনে কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্যাক্সনি-আনহাল্টের ভোটে জাতীয় সরকারের প্রতি অসন্তোষও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। অর্থাৎ এই নির্বাচন শুধুমাত্র একটি রাজ্যের রাজনৈতিক ফল নয়, মের্ৎসের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের জনপ্রিয়তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছে।
### ‘ফায়ারওয়াল’ নীতি এবার চ্যালেঞ্জের মুখে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলি অতি-ডানপন্থী শক্তির সঙ্গে সরকার গঠন বা আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা এড়িয়ে চলেছে। জার্মান রাজনীতিতে এই অবস্থানকে প্রায়ই **‘firewall’** বা রাজনৈতিক প্রতিরোধ-প্রাচীর হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফলাফলের পর সেই নীতিই এখন বড় পরীক্ষার মুখে। AfD সবচেয়ে বড় দল হলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তাই অন্য দলগুলির কোনও বিধায়ককে পাশে পাওয়া কিংবা কোনও দল ভোটদানে বিরত থাকলে AfD-র সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, AfD ইতিমধ্যেই মের্ৎসের CDU-র কিছু আইনপ্রণেতার সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। তবে CDU-সহ মূলধারার দলগুলি AfD-র সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা করবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
### শুধু জার্মানি নয়, ইউরোপেও উদ্বেগ
স্যাক্সনি-আনহাল্টে AfD-র এই সাফল্য জার্মানির গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপীয় রাজনীতিতেও আলোড়ন তৈরি করেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী ও অভিবাসন-বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ইতিমধ্যেই আলোচনার বিষয়। জার্মানির মতো ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিতে AfD-র এই শক্তিবৃদ্ধি সেই প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
ফ্রান্স ও পোল্যান্ডের রাজনৈতিক মহল থেকেও এই ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। কারণ জার্মানির রাজনীতিতে AfD-র প্রভাব বাড়লে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন, ইউক্রেন, রাশিয়া এবং অর্থনৈতিক নীতিতেও তার পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।
### ২০২৯-এর জাতীয় নির্বাচনের আগে বড় সংকেত?
AfD-র কাছে স্যাক্সনি-আনহাল্টের জয় শুধুমাত্র একটি রাজ্য নির্বাচনের সাফল্য নয়। দলটি ইতিমধ্যেই এই ফলকে ভবিষ্যতের জাতীয় রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। ২০২৯ সালের জার্মান ফেডারেল নির্বাচনের আগে দলটির এই উত্থান অন্য দলগুলির জন্য বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠতে পারে।
তবে রাজ্য সরকার গঠন করতে না পারলে AfD-র জয় কতটা বাস্তব ক্ষমতায় রূপান্তরিত হবে, সেটাই এখন দেখার। ৩৯টি আসন নিয়ে বৃহত্তম দল হওয়া এবং সরকার পরিচালনা করা—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
### জার্মান রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়
স্যাক্সনি-আনহাল্টের ভোটের ফলাফল স্পষ্ট করে দিয়েছে, জার্মানির রাজনৈতিক মানচিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। একদিকে AfD অভূতপূর্ব জনসমর্থন পেয়েছে, অন্যদিকে CDU-সহ প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলির ভোট কমেছে। যুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানিতে এই পরিবর্তনের গুরুত্ব তাই অত্যন্ত বড়।
এখন নজর থাকবে সরকার গঠনের আলোচনায়। AfD কি অন্য দলের সমর্থন আদায় করে রাজ্য সরকার গড়তে পারবে? নাকি জার্মানির রাজনৈতিক ‘ফায়ারওয়াল’ শেষ পর্যন্ত অক্ষত থাকবে? স্যাক্সনি-আনহাল্টের এই ফলাফল আপাতত সেই প্রশ্নই সামনে এনে দিয়েছে।


