পুজো ও দীপাবলির কেনাকাটার মরসুম শুরু হওয়ার আগেই দেশের ক্রেতাদের জন্য এল বড় ধাক্কা। আগামী ১ অক্টোবর থেকে এসি, এলইডি টিভি, ওয়াশিং মেশিন, ফ্রিজ-সহ একাধিক গৃহস্থালি বৈদ্যুতিন পণ্যের দাম ৫ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে শিল্পমহল। বিভিন্ন সংস্থার দাবি, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, পরিবহণ ব্যয়, মুদ্রার ওঠানামা এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই মূল্যবৃদ্ধি কার্যত অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
শিল্প সূত্রের মতে, ২০২৬ সালে এটি গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি শিল্পের তৃতীয় দফার মূল্যবৃদ্ধি। বিশেষ করে উৎসবের মরসুমে যখন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়, ঠিক তার আগেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
### কোন পণ্যের দাম কত বাড়তে পারে?
শিল্পমহলের তথ্য অনুযায়ী—
* এয়ার কন্ডিশনার (AC): ৫–৮ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে।
* এলইডি টিভি: ৩–৭ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
* ওয়াশিং মেশিন ও রেফ্রিজারেটর: প্রায় ৩–৪ শতাংশ দাম বাড়তে পারে।
* কিছু ব্র্যান্ড ইতিমধ্যেই ৪–১০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা করেছে।
### কেন বাড়ছে দাম?
সংস্থাগুলির মতে, উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের দাম গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে—
* তামা (Copper)
* ইস্পাত (Steel)
* অ্যালুমিনিয়াম
* প্লাস্টিক ও ক্রুড অয়েল ডেরিভেটিভস
* আন্তর্জাতিক পরিবহণ ব্যয় (Freight Cost)
* মুদ্রা বিনিময় হারের অস্থিরতা
বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার চলমান পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব ভারতের উৎপাদন শিল্পেও পড়েছে বলে শিল্পপতিদের বক্তব্য।
### কোন কোন সংস্থা দাম বাড়াচ্ছে?
একাধিক বড় সংস্থা ইতিমধ্যেই মূল্যবৃদ্ধির কথা নিশ্চিত করেছে।
তাদের মধ্যে রয়েছে—
* Blue Star
* Godrej Appliances
* Haier
* Daikin
* Super Plastronics
* LG (এসি বিভাগে মূল্যবৃদ্ধির তথ্য সামনে এসেছে)
* Bosch Home Comfort (Hitachi ব্র্যান্ডের এসি)
অন্যদিকে Panasonic জানিয়েছে, তারা এখনও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে।
### তামার দামই সবচেয়ে বড় কারণ
এসি শিল্পে তামা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। একটি সাধারণ এয়ার কন্ডিশনারে প্রায় ৩ থেকে ৪ কেজি তামা ব্যবহৃত হয়।
শিল্প প্রতিনিধিদের দাবি, গত বছরের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে তামার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সেই সঙ্গে ইস্পাত ও অন্যান্য ধাতুর মূল্যবৃদ্ধিও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে। ফলে পুরনো দামে পণ্য বিক্রি করলে সংস্থাগুলির লাভের মার্জিন কমে যাচ্ছে।
### উৎসবের কেনাকাটায় কি প্রভাব পড়বে?
পুজো, দশেরা ও দীপাবলির সময় সাধারণত গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির বার্ষিক বিক্রির ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সম্পন্ন হয়।
তবে শিল্পমহলের একাংশের মতে, ক্রেতাদের জন্য এখনও কিছুটা স্বস্তির জায়গা রয়েছে। কারণ আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসেই অনেক ডিলার পুরনো দামে বড় পরিমাণে স্টক তুলে রেখেছেন। ফলে দীপাবলি পর্যন্ত অনেক দোকানে পুরনো দামের পণ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই পুরনো স্টক শেষ হয়ে গেলে নতুন দামে পণ্য বিক্রি শুরু হবে বলে সংস্থাগুলি জানিয়েছে।
### আরও বাড়তে পারে দাম
কিছু সংস্থা ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে অক্টোবরের পরও মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ—
* Haier অক্টোবরের পর ডিসেম্বর এবং জানুয়ারিতেও আরও দফায় দাম বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা বলেছে।
* Daikin সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই কিছু মডেলের দাম ৮–১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
* কিছু টিভি নির্মাতা জানিয়েছে, বিশেষ করে ছোট স্ক্রিনের মডেলগুলিতে পরবর্তীকালে আরও বেশি মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে।
### এখন কিনবেন, নাকি অপেক্ষা করবেন?
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, যাঁদের আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এসি, টিভি বা অন্য গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে, তাঁদের স্থানীয় ডিলারদের কাছে পুরনো স্টকের অফারগুলি যাচাই করে নেওয়া উপকারী হতে পারে। কারণ সব ব্র্যান্ড একই দিনে একই হারে দাম বাড়াচ্ছে না, ফলে বিভিন্ন সংস্থার অফার ও স্টকে পার্থক্য থাকতে পারে।
### শিল্পের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে উৎসবের মরসুমে বিক্রির গতি ধরে রাখাও সংস্থাগুলির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্পমহলের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী কয়েক মাসেও গৃহস্থালি বৈদ্যুতিন পণ্যের দামে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।


