শক্তিশালী ভূমিকম্পে কার্যত বিপর্যস্ত ইন্দোনেশিয়া। শনিবার সকালে পূর্ব ইন্দোনেশিয়ার উপকূলের কাছে ৭.৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেশের অন্য প্রান্তে ফের শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়েছে। দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির মাত্রা প্রায় ৬.৯ বলে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা USGS-এর তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ফলে একের পর এক ভূমিকম্পে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে ইন্দোনেশিয়াজুড়ে।
সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির উৎসস্থল ছিল উত্তর সুমাত্রা অঞ্চলে এবং ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার। অর্থাৎ প্রথম ভূমিকম্পের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই নতুন করে কম্পন অনুভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।
তবে দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি প্রথমটির তুলনায় অনেক গভীরে হওয়ায় এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব তুলনামূলক কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গভীর ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে ভূপৃষ্ঠে কম্পনের তীব্রতা অনেক সময় অগভীর ভূমিকম্পের তুলনায় কম অনুভূত হয়। তা সত্ত্বেও ইতিমধ্যেই বিপর্যস্ত এলাকায় নতুন করে কম্পন হওয়ায় উদ্ধারকারী দল এবং প্রশাসনের উদ্বেগ বেড়েছে।
### ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ভয়াবহ পরিস্থিতি
শনিবার ভোরে পূর্ব ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। USGS-এর তথ্য অনুযায়ী, কম্পনের কেন্দ্রস্থল ছিল ফ্লোরেস দ্বীপের উত্তর দিকে, এন্ডে শহরের উত্তর-পশ্চিমে। ভূমিকম্পটি ছিল তুলনামূলকভাবে অগভীর, প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। ফলে কম্পনের তীব্রতা ভূপৃষ্ঠে ব্যাপকভাবে অনুভূত হয় এবং একাধিক এলাকায় বাড়িঘর ও অন্যান্য পরিকাঠামোর ক্ষতি হয়।
প্রথম কম্পনের পর বহু মানুষ আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। কোথাও বাড়ির দেওয়াল ভেঙে পড়ে, কোথাও সম্পূর্ণ বাড়ি ধসে যায়। একাধিক এলাকায় ভূমিধসের ঘটনাও ঘটে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গত এলাকায় পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ সংযোগ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়।
### লাফিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা
প্রথম ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। বিভিন্ন সময়ের সরকারি হিসাবের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলিতে মৃতের সংখ্যা ৩৮ থেকে ৪৭-এর মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্ধারকাজ এখনও চলছে এবং দুর্গম এলাকায় পৌঁছতে সমস্যা হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলির মধ্যে রয়েছে নাজেকেও এবং সিক্কা রিজেন্সি। মাউমেরে এলাকায় বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে। রাস্তা ধসে যাওয়া এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে উদ্ধারকারী দলকে একাধিক বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।
প্রায় ২ হাজার মানুষকে ইতিমধ্যেই নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। বহু বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সরকারি ভবনেরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফলে শুধু প্রাণহানিই নয়, স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
### প্রথম ভূমিকম্পের পর একাধিক কম্পন
৭.৭ মাত্রার মূল ভূমিকম্পের পর একের পর এক আফটারশক অনুভূত হয়। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রথম কম্পনের পর অন্তত তিনটি শক্তিশালী আফটারশক হয়, যার মাত্রা ছিল ৫.৯, ৫.৬ এবং ৬.১। অন্য আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে আরও বহু আফটারশকের কথা বলা হয়েছে।
এই ধারাবাহিক কম্পনের কারণে দুর্গত এলাকার বাসিন্দাদের অনেকেই বাড়িতে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ভূমিকম্পের পর পরবর্তী কম্পন বা আফটারশক স্বাভাবিক ঘটনা হলেও সেগুলির মধ্যে কোনওটি শক্তিশালী হলে নতুন করে ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ফিরে যাওয়ার আগে নিরাপত্তা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
### সুনামির সতর্কতাতেও আতঙ্ক
শুধু ভূমিকম্প নয়, এর পর সম্ভাব্য সুনামি নিয়েও আতঙ্ক ছড়ায়। ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু এলাকায় সুনামি সতর্কতা জারি করেছিল। পরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সেই সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়। তবে বিভিন্ন এলাকায় ছোট আকারের সুনামি তরঙ্গ রেকর্ড করা হয়েছিল।
ফ্লোরেস এবং আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়। অনেকে নিরাপদ উঁচু জায়গায় চলে যান। ভূমিকম্পের সঙ্গে সুনামির সম্ভাবনা থাকায় উদ্ধারকারী সংস্থাগুলিকেও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে।
### ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে বহু মানুষ
ভূমিকম্পের পরে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে উদ্ধারকাজ। একাধিক এলাকায় ভূমিধসের কারণে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। কোথাও বিদ্যুৎ নেই, কোথাও মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থা কাজ করছে না। ফলে দুর্গত এলাকায় দ্রুত পৌঁছতে পারছেন না উদ্ধারকারীরা।
বিশেষ করে নাজেকেও অঞ্চলে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। কিছু দুর্গম এলাকায় স্থলপথে পৌঁছনো সম্ভব না হওয়ায় বিকল্প পথে উদ্ধারকারী দল পাঠানোর চেষ্টা চলছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও কেউ জীবিত আটকে রয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
### হাসপাতাল ও পরিকাঠামোতেও ক্ষতি
ভূমিকম্পের অভিঘাতে শুধু বাড়িঘর নয়, বিভিন্ন জনপরিষেবা পরিকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সরকারি ভবন এবং অন্যান্য স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গিয়েছে। ফলে আহতদের চিকিৎসা এবং দুর্গত মানুষকে পরিষেবা দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
অনেক মানুষ ঘর হারিয়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। তাঁদের জন্য খাবার, পানীয় জল, চিকিৎসা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা এখন প্রশাসনের অন্যতম বড় দায়িত্ব। একইসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত সচল করাও জরুরি।
### দ্বিতীয় ভূমিকম্পে নতুন করে উদ্বেগ
এই পরিস্থিতির মধ্যেই উত্তর সুমাত্রায় দ্বিতীয় শক্তিশালী ভূমিকম্পের খবর সামনে আসে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই কম্পনের মাত্রা ৬.৪ থেকে ৬.৯-এর মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। USGS-ভিত্তিক প্রতিবেদনে দ্বিতীয় কম্পনের মাত্রা ৬.৯ বলা হয়েছে, আবার অন্য সংস্থাগুলির হিসাবে কিছুটা ভিন্ন মাত্রা এসেছে।
সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে জার্মান ভূ-বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যের ভিত্তিতে দ্বিতীয় কম্পনের গভীরতা প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার এবং উৎসস্থল উত্তর সুমাত্রা বলে জানানো হয়েছে। গভীরতার কারণে এর প্রভাব প্রথম ভূমিকম্পের মতো ব্যাপক না হলেও পরপর শক্তিশালী কম্পন ইন্দোনেশিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়েছে।
### কেন বারবার ভূমিকম্প হয় ইন্দোনেশিয়ায়?
ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘Ring of Fire’-এর মধ্যে অবস্থিত। এই অঞ্চলে একাধিক টেকটোনিক প্লেটের সক্রিয় গতিবিধির কারণে নিয়মিত ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। অতীতে ইন্দোনেশিয়া একাধিক ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির সাক্ষী হয়েছে।
তাই বড় ভূমিকম্পের পরও পরবর্তী কম্পনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ প্রথম কম্পনে দুর্বল হয়ে যাওয়া কোনও ভবন পরবর্তী শক্তিশালী কম্পনে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে।
### উদ্ধারকাজে বড় বাধা ভূমিধস
এই ভূমিকম্পে উদ্ধারকাজের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূমিধস। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় মাটি ধসে যাওয়ার কারণে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অ্যাম্বুল্যান্স, উদ্ধারকারী গাড়ি এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছনো কঠিন হচ্ছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় প্রত্যন্ত এলাকার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পেতেও সময় লাগছে। ফলে বর্তমানে যে মৃত ও আহতের সংখ্যা প্রকাশ করা হচ্ছে, তা পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
### আতঙ্কের মধ্যেও চলছে উদ্ধার অভিযান
পরপর ভূমিকম্প এবং আফটারশকের মধ্যেও উদ্ধারকারী দল কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের সন্ধান করা, আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং দুর্গত মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়াই এখন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি নতুন কোনও শক্তিশালী কম্পন বা সুনামির আশঙ্কা রয়েছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়া সরকারের তরফে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের সেখানে রাখা হতে পারে। উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পরই ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, শনিবারের ৭.৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পে ইতিমধ্যেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ইন্দোনেশিয়ায়। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফের শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। একদিকে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বহু মানুষ এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা। রাস্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল দুর্গত এলাকায় দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া। পাশাপাশি আফটারশকের সম্ভাবনা এবং নতুন কোনও সুনামি পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে কি না, তার উপরও নজর রাখা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার মতো ভূমিকম্পপ্রবণ দেশে এই বিপর্যয় আবারও প্রমাণ করল, শক্তিশালী ভূমিকম্পের আগে ও পরে দ্রুত সতর্কতা, উন্নত উদ্ধার পরিকাঠামো এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।


