রাস্তায় টোটোর অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণে এবার আরও কড়া পদক্ষেপের পথে হাঁটল পশ্চিমবঙ্গের পরিবহণ দফতর। **জাতীয় সড়ক, রাজ্য সড়ক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় অনুমোদনহীন টোটো বা ই-রিকশার চলাচল বন্ধ করতে রাজ্য পুলিশের ডিজিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।** পরিবহণ দফতরের এই উদ্যোগের ফলে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে টোটো চলাচলের ক্ষেত্রে নতুন করে কড়াকড়ি শুরু হতে পারে।
পরিবহণ দফতরের তরফে জানানো হয়েছে, গত ৭ আগস্ট রাজ্য পুলিশের ডিজিকে এই চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে পরিবহণ দফতরের প্রধান সচিব রবিন্দর সিং সংশ্লিষ্ট বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রকের নির্দেশিকা এবং রাজ্যের পূর্ববর্তী নির্দেশের কথা উল্লেখ করে পুলিশকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
### টোটো নিয়ে কেন এত কড়া পদক্ষেপ?
রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় টোটোর সংখ্যা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শহর থেকে শহরতলি কিংবা গ্রামীণ এলাকায় অল্প দূরত্বের যাতায়াতে টোটো সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় পরিবহণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, বাজার এবং আবাসিক এলাকার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে টোটো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু একইসঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, নির্দিষ্ট স্থানীয় রাস্তার বাইরে অনেক টোটো জাতীয় সড়ক এবং রাজ্য সড়কেও চলাচল করছে।
এর ফলে একদিকে যেমন যানজট তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে দ্রুতগতির গাড়ির সঙ্গে টোটোর সংঘর্ষের সম্ভাবনাও বাড়ছে। পরিবহণ দফতরের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পরিস্থিতি পথ নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
### কোন কোন রাস্তায় টোটো চলাচল নিষিদ্ধ?
পরিবহণ দফতরের চিঠিতে রাজ্যের ২০১৬ সালের নির্দেশের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেই নির্দেশ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু স্থানীয় রাস্তা ছাড়া **রাজ্য সড়ক, জাতীয় সড়ক এবং অন্যান্য প্রধান সড়কে টোটো চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।**
তবে কোনও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমোদন থাকলে ব্যতিক্রম হতে পারে। অর্থাৎ সমস্ত ধরনের ই-রিকশা বা টোটোকে একেবারে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে না। মূলত অনুমোদিত রুটের বাইরে চলাচল করা টোটোর বিরুদ্ধেই পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে টোটোর ভূমিকা রয়েছে। তাই স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ না করে নির্দিষ্ট রাস্তা ও রুট অনুযায়ী টোটো চলাচল নিয়ন্ত্রণ করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বলে বোঝা যাচ্ছে।
### লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটির জন্য ই-রিকশাপরিবহণ দফতরের চিঠিতে কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রকের নির্দেশিকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ই-রিকশাকে মূলত **লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটির** জন্য নির্ধারিত পরিবহণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি বলতে সাধারণত কোনও যাত্রীকে বড় পরিবহণ ব্যবস্থা—যেমন রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড বা নির্দিষ্ট গন্তব্য—থেকে কাছাকাছি এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা বোঝায়।
এই ব্যবস্থায় টোটো বা ই-রিকশা অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন এই ধরনের যানবাহন বড় এবং ব্যস্ত সড়কে দীর্ঘ দূরত্বে চলাচল শুরু করে। তখন দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে গতি ও আকারের পার্থ্যের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
### পুলিশের উপর বাড়ল দায়িত্বপরিবহণ দফতরের চিঠির পর এখন রাজ্য পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনুমোদনহীন টোটো যাতে জাতীয় সড়ক, রাজ্য সড়ক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় চলাচল করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য পুলিশকে আরও সক্রিয় হতে বলা হয়েছে।
প্রয়োজনে অধস্তন পুলিশ আধিকারিকদেরও যথাযথ নির্দেশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু জেলা বা উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিকদের নয়, মাঠপর্যায়ে কর্মরত পুলিশকর্মীদেরও এই বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে।
পরিবহণ দফতরের নির্দেশ অমান্য করে কেউ নিষিদ্ধ রাস্তায় টোটো চালালে তাঁর বিরুদ্ধে **১৯৮৮ সালের Motor Vehicles Act এবং সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা** নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
### যানজট কমানোর লক্ষ্যটোটোর অবাধ চলাচল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন এলাকায় অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ব্যস্ত সড়কে টোটো হঠাৎ থেমে যাত্রী ওঠানো-নামানো কিংবা একাধিক টোটোর একসঙ্গে চলাচলের কারণে যানজট তৈরি হয় বলে অভিযোগ করেন অনেক গাড়িচালক।
বাসচালকদের সংগঠনগুলিও অতীতে টোটোর সংখ্যা এবং চলাচল নিয়ে আপত্তি তুলেছে। কিছু ক্ষেত্রে টোটোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বাস পরিষেবা বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবহণ দফতরের নতুন পদক্ষেপের অন্যতম লক্ষ্য তাই গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলিতে যান চলাচল আরও স্বাভাবিক রাখা।
### পথ নিরাপত্তাও বড় বিষয়
যানজটের পাশাপাশি পথ নিরাপত্তার বিষয়টিও এই সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ। জাতীয় সড়ক ও রাজ্য সড়কে সাধারণত বাস, ট্রাক, গাড়ি এবং অন্যান্য যানবাহন তুলনামূলক বেশি গতিতে চলাচল করে।
এই ধরনের রাস্তায় ছোট এবং তুলনামূলক ধীরগতির টোটো চলাচল করলে গাড়ির গতি ও দূরত্ব নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে রাতে বা খারাপ আবহাওয়ার সময় ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তাই পরিবহণ দফতর মনে করছে, নির্দিষ্ট স্থানীয় রুটে টোটো চলাচল সীমাবদ্ধ রাখলে একদিকে সাধারণ মানুষের লাস্ট মাইল পরিবহণের সুবিধা বজায় থাকবে, অন্যদিকে বড় সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে।
### টোটো চালকদের জন্য কী পরিবর্তন আসতে পারে?
নতুন নির্দেশ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে টোটো চালকদের নির্দিষ্ট রুট মেনে চলতে হতে পারে। জাতীয় বা রাজ্য সড়কের পরিবর্তে স্থানীয় রাস্তা ব্যবহার করতে হতে পারে। তবে কোন এলাকায় কোন রুট অনুমোদিত এবং কোথায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে, তা স্থানীয় প্রশাসনিক নির্দেশের উপর নির্ভর করবে।
তাই টোটো চালকদের নিজেদের এলাকার অনুমোদিত রুট সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে কোনও বিশেষ অনুমোদন থাকলে তার বৈধ নথিপত্রও সঙ্গে রাখা প্রয়োজন হতে পারে।
### আগামী দিনে আরও কড়া নজরদারি?
পরিবহণ দফতরের চিঠির পর রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় টোটো চলাচল নিয়ে নজরদারি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পুলিশ কীভাবে এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
একদিকে সাধারণ মানুষের সহজ এবং সস্তা পরিবহণের সুযোগ বজায় রাখা, অন্যদিকে জাতীয় ও রাজ্য সড়কে যানজট এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে, **পশ্চিমবঙ্গে জাতীয় সড়ক, রাজ্য সড়ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় অনুমোদনহীন টোটো চলাচল বন্ধে পরিবহণ দফতরের এই পদক্ষেপ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।** টোটো সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ লাস্ট মাইল পরিবহণ ব্যবস্থা হলেও তার চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। সেই নিয়ম যাতে কার্যকরভাবে মানা হয়, তা নিশ্চিত করতেই এবার রাজ্য পুলিশকে আরও সক্রিয় হতে বলা হয়েছে।
আগামী দিনে এই নির্দেশ বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলিতে টোটো চলাচলের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। একইসঙ্গে যানজট কমানো এবং পথ নিরাপত্তা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেও নজর থাকবে।


