তফসিলি জাতি (SC), তফসিলি উপজাতি (ST) এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (OBC) সংরক্ষণ ব্যবস্থায় আয়ভিত্তিক উপ-সংরক্ষণ (Income-based Sub-Quota) চালুর দাবিতে দায়ের হওয়া একটি মামলায় সুপ্রিম কোর্টে নিজেদের স্পষ্ট অবস্থান জানাল কেন্দ্র সরকার। কেন্দ্রের বক্তব্য, সংরক্ষণের মূল ভিত্তি কখনওই অর্থনৈতিক অবস্থা নয়; বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা সামাজিক বৈষম্য, বঞ্চনা এবং ঐতিহাসিক পশ্চাৎপদতাই এই সাংবিধানিক ব্যবস্থার ভিত্তি। তাই সংরক্ষণের মধ্যে শুধুমাত্র আয়ের ভিত্তিতে নতুন কোনও উপ-শ্রেণি তৈরি করা সংবিধানের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা হলফনামায় কেন্দ্র জানিয়েছে, **SC ও ST সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে ‘ক্রিমি লেয়ার’ (Creamy Layer) নীতি প্রয়োগ করা উচিত নয়**। সরকারের যুক্তি, কোনও ব্যক্তি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হয়ে গেলেও তিনি সামাজিক বৈষম্য বা জাতিগত বৈষম্যের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে যান না। ফলে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে সংরক্ষণের সুবিধা কেড়ে নেওয়া সাংবিধানিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মামলায় আবেদনকারীদের দাবি ছিল, সংরক্ষিত শ্রেণির মধ্যেও অপেক্ষাকৃত আর্থিকভাবে দুর্বলদের জন্য আলাদা উপ-সংরক্ষণ বা বিশেষ সুবিধা চালু করা হোক। তাঁদের মতে, সংরক্ষণের অধিকাংশ সুবিধা দীর্ঘদিন ধরে একই পরিবারের বা তুলনামূলকভাবে সচ্ছল অংশের কাছে চলে যাচ্ছে। তাই প্রকৃত দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা মানুষদের কাছে সুযোগ পৌঁছে দিতে আয়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে কেন্দ্র সরকার এই যুক্তির বিরোধিতা করে জানিয়েছে, ভারতের সংরক্ষণ নীতি মূলত **ঐতিহাসিক ও সামাজিক বঞ্চনার প্রতিকার** হিসেবে গড়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক দুর্বলতার জন্য ইতিমধ্যেই **Economically Weaker Sections (EWS)**-এর মতো পৃথক সাংবিধানিক ব্যবস্থা রয়েছে। তাই SC, ST ও OBC সংরক্ষণের ভিতরে আবার আয়ের ভিত্তিতে নতুন বিভাজন তৈরি করা সংরক্ষণের মূল দর্শনকে দুর্বল করতে পারে।
হলফনামায় আরও বলা হয়েছে, বিশেষ করে তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষরা এখনও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্য ও বঞ্চনার মুখোমুখি হন। এই বৈষম্য কেবল আর্থিক অবস্থার উপর নির্ভর করে না। ফলে কোনও ব্যক্তি উচ্চ আয়ের হলেও তাঁর সামাজিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের সম্ভাবনা থেকে যায়। সেই কারণেই SC ও ST সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ‘ক্রিমি লেয়ার’ নীতি প্রযোজ্য নয় বলে কেন্দ্রের মত।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার রায় ভবিষ্যতে ভারতের সংরক্ষণ নীতির উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, সংরক্ষণের মধ্যে অর্থনৈতিক মানদণ্ড কতটা প্রযোজ্য হবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আইনি ও সাংবিধানিক বিতর্ক চলছে। কেন্দ্রের বর্তমান অবস্থান সেই বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে OBC সংরক্ষণে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ‘ক্রিমি লেয়ার’ নীতি কার্যকর থাকলেও SC ও ST সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। এবার সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্র সেই অবস্থানই পুনরায় স্পষ্ট করেছে। সরকারের দাবি, সংরক্ষণের লক্ষ্য শুধুমাত্র আর্থিক উন্নয়ন নয়, বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক বৈষম্যের প্রতিকার নিশ্চিত করা।
এখন এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট কী পর্যবেক্ষণ দেয় এবং সংরক্ষণ নীতির ভবিষ্যৎ ব্যাখ্যা কীভাবে নির্ধারণ করে, সেদিকেই নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহল, আইন বিশেষজ্ঞ এবং সংরক্ষণ নীতি নিয়ে আগ্রহী বিভিন্ন মহলের। আদালতের চূড়ান্ত রায় ভারতের সংরক্ষণ ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিশা দেখাতে পারে।


