দেশের অসংগঠিত ক্ষেত্রে (Unorganised Sector) কর্মরত লক্ষ লক্ষ গৃহকর্মীর জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটির দাবি জোরালো করলেন এক রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, যে সমস্ত মহিলা বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করেন, তাঁরাও অন্যান্য কর্মজীবী নারীদের মতো মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং সামাজিক সুরক্ষার অধিকার পাওয়ার যোগ্য। তাই কেন্দ্র সরকারের উচিত এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা এবং গৃহকর্মীদের জন্য পৃথক নীতি তৈরি করা। এই দাবি সামনে আসতেই শ্রমিক অধিকার ও নারীকল্যাণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বর্তমানে দেশের অধিকাংশ গৃহকর্মী অসংগঠিত ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত। ফলে তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, বেতন, স্বাস্থ্যবিমা, পেনশন কিংবা মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো সুবিধা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিশ্চিত নয়। বহু মহিলা গর্ভাবস্থার শেষ সময় পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য হন এবং সন্তান জন্মের কিছুদিন পরই জীবিকার তাগিদে ফের কাজে যোগ দেন। এর ফলে মা ও নবজাতক—উভয়ের স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, গৃহকর্মীরা প্রতিদিন অসংখ্য পরিবারের দৈনন্দিন কাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তাঁদের শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি এবং সামাজিক সুরক্ষা এখনও নিশ্চিত হয়নি। বিশেষ করে মাতৃত্বের সময় তাঁদের আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়। তাই তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি চালু করা হলে তা নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত বহু মহিলা মাতৃত্বকালীন ছুটির আইনি সুবিধা পান। কিন্তু একই ধরনের সুরক্ষা অসংগঠিত ক্ষেত্রের বিপুল সংখ্যক মহিলা শ্রমিকের নাগালের বাইরে। ফলে কর্মক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে গৃহকর্মীদেরও এই সুবিধার আওতায় আনা প্রয়োজন।
শ্রমিক সংগঠনগুলির একাংশ দীর্ঘদিন ধরেই গৃহকর্মীদের জন্য শ্রম আইন অনুযায়ী সুরক্ষা, ন্যূনতম মজুরি, স্বাস্থ্যবিমা এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধার দাবি জানিয়ে আসছে। তাঁদের মতে, দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে লক্ষ লক্ষ মহিলা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাঁদের অধিকাংশের কোনও লিখিত চুক্তি বা চাকরির নিরাপত্তা নেই। ফলে মাতৃত্বের সময় কাজ বন্ধ হলে আয়ের পথও বন্ধ হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাতৃত্বকালীন ছুটি শুধুমাত্র একজন কর্মজীবী মহিলার অধিকার নয়, এটি মা ও শিশুর সুস্থতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, চিকিৎসা এবং শিশুর পরিচর্যার সুযোগ নিশ্চিত হলে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকিও কমানো সম্ভব। সেই কারণেই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাসহ (ILO) বিভিন্ন সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই মাতৃত্বকালীন সুরক্ষার উপর জোর দিয়ে আসছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ভারতের মাতৃত্বকালীন সুবিধা সংক্রান্ত আইন মূলত নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মহিলাদের জন্য প্রযোজ্য। অসংগঠিত ক্ষেত্রের বিপুল সংখ্যক কর্মী এখনও সেই সুরক্ষার বাইরে রয়েছেন। তাই গৃহকর্মীদের জন্য আলাদা নীতিমালা বা বিদ্যমান আইনে সংশোধনের মাধ্যমে এই সুবিধা কার্যকর করা যেতে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই প্রস্তাব এখনও নীতিগত আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং এ বিষয়ে কেন্দ্র সরকারের তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, এই দাবি বাস্তবায়িত হলে দেশের লক্ষ লক্ষ গৃহকর্মী মহিলা প্রথমবারের মতো মাতৃত্বকালীন সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার পেতে পারেন, যা নারী শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করবে।


