পশ্চিমবঙ্গে রেশন ব্যবস্থায় নতুন বায়োমেট্রিক যাচাইকরণ নিয়মকে ঘিরে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি রাজ্য সরকার রেশন তোলার ক্ষেত্রে **আইরিস (চোখের মণি) স্ক্যান বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ** জারি করেছিল। তবে সেই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছে কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় খাদ্য মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী আইরিস স্ক্যানকে বাধ্যতামূলক করা যায় না।
সূত্রের খবর, এই বিষয়টি নিয়ে **অল ইন্ডিয়া ফেয়ার প্রাইস শপ ডিলার্স ফেডারেশন** কেন্দ্রীয় খাদ্য সচিবের কাছে অভিযোগ জানায়। সংগঠনের দাবি, আধার-ভিত্তিক প্রমাণীকরণ ব্যবস্থায় আঙুলের ছাপই প্রধান বায়োমেট্রিক পদ্ধতি। কোনও কারণে আঙুলের ছাপ না মিললে তবেই ওটিপি বা আইরিস স্ক্যানের মতো বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু শুরু থেকেই আইরিস স্ক্যান বাধ্যতামূলক করা বর্তমান নির্দেশিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে কেন্দ্রের মত।
গত ১৩ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের খাদ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে একটি নির্দেশিকা জারি করা হয়। সেখানে বলা হয়, রেশন গ্রাহকদের পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আইরিস স্ক্যান ব্যবহারে জোর দিতে হবে। এই নির্দেশ প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই রেশন ডিলারদের একাংশ আপত্তি তোলে। তাঁদের বক্তব্য, বহু এলাকায় এখনও আইরিস স্ক্যানের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নেই। ফলে সাধারণ গ্রাহক এবং ডিলার—উভয়কেই সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
কেন্দ্রীয় খাদ্য সচিবের সঙ্গে আলোচনার পর ডিলার সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, **আধার আইনের আওতায় আইরিস স্ক্যানকে বাধ্যতামূলক করার কোনও বিধান নেই।** তাই রাজ্যের নির্দেশ পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। কেন্দ্রের অবস্থান অনুযায়ী, আগের মতোই প্রথমে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করা হবে। শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিলে বিকল্প হিসেবে ওটিপি বা আইরিস স্ক্যান ব্যবহার করা যেতে পারে।
রেশন ব্যবস্থায় বায়োমেট্রিক যাচাইকরণের মূল উদ্দেশ্য হল প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে খাদ্যশস্য পৌঁছে দেওয়া এবং ভুয়ো বা ডুপ্লিকেট রেশন কার্ডের ব্যবহার রোধ করা। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ রাজ্যে **আধার-ভিত্তিক e-POS (Electronic Point of Sale)** মেশিনের মাধ্যমে আঙুলের ছাপ মিলিয়ে রেশন বিতরণ করা হয়। প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দিলে বিকল্প প্রমাণীকরণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এদিকে এই ইস্যু নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে শীঘ্রই বৈঠক হতে পারে বলে জানা গিয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আগামী সপ্তাহে কেন্দ্রীয় খাদ্য সচিব কলকাতায় এসে রাজ্যের খাদ্য সচিবের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। সেই বৈঠকের পর নতুন কোনও সিদ্ধান্ত বা সংশোধিত নির্দেশিকা জারি হয় কি না, সেদিকেই নজর থাকবে |
বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়োমেট্রিক যাচাইকরণ ব্যবস্থা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তা এমন হওয়া উচিত যাতে প্রবীণ ব্যক্তি, শ্রমজীবী মানুষ বা যাঁদের আঙুলের ছাপ পড়তে সমস্যা হয়, তাঁদের রেশন পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও বাধা সৃষ্টি না হয়। সেই কারণেই বিকল্প যাচাইকরণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে কোনও একটি বিকল্প পদ্ধতিকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করলে বাস্তব ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে বলে তাঁদের মত।
রেশন গ্রাহকদের জন্য আপাতত বড় কোনও পরিবর্তন কার্যকর হয়নি। বর্তমানে আগের নিয়মেই রেশন বিতরণ চলবে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। অর্থাৎ প্রথমে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে যাচাই করা হবে এবং প্রয়োজনে বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। তবে কেন্দ্র-রাজ্যের আলোচনার ফলাফলের উপর ভবিষ্যতের চূড়ান্ত নীতি নির্ভর করবে।
সব মিলিয়ে, **পশ্চিমবঙ্গের নতুন আইরিস-ভিত্তিক রেশন যাচাইকরণ নিয়ম নিয়ে কেন্দ্র আপত্তি জানানোয় নতুন প্রশাসনিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।** আগামী বৈঠকের পর এই বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়, সেদিকেই নজর থাকবে রেশন গ্রাহক, ডিলার এবং প্রশাসনের।


