দেশজুড়ে একাধিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগের পর পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর করতে বড় পদক্ষেপ নিল কেন্দ্র সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছেন, দেশের জনপরীক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কারের লক্ষ্যে একটি **উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্ক ফোর্স** গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন ইনফোসিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং আধার প্রকল্পের অন্যতম স্থপতি **নন্দন নিলেকানি**।
প্রধানমন্ত্রী এক ভিডিও বার্তায় জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পরীক্ষা সংক্রান্ত অনিয়মে বহু ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকার ইতিমধ্যেই প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আদালত (Fast-Track Court) গঠন এবং কঠোর আইন আনার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, তার জন্য পরীক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি বলেই এই টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে।
সরকারের দাবি, নতুন কমিটি দেশের বিভিন্ন জনপরীক্ষা—বিশেষ করে জাতীয় স্তরের প্রবেশিকা ও নিয়োগ পরীক্ষাগুলিকে আরও নিরাপদ ও নির্ভুল করার জন্য সুপারিশ করবে। পরীক্ষা পরিচালনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ডিজিটাল নিরাপত্তা, প্রশ্নপত্র সুরক্ষা, পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক সংস্কার—এসব বিষয়ই থাকবে কমিটির আলোচনার কেন্দ্রে। টাস্ক ফোর্সের সুপারিশের ভিত্তিতে ভবিষ্যতের পরীক্ষা ব্যবস্থা আরও নির্ভরযোগ্য করে তোলা হবে বলে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন।
শুধু নন্দন নিলেকানি নন, এই কমিটিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন প্রাক্তন ইসরো (ISRO) প্রধান এস. সোমনাথ, প্রাক্তন ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (IB) প্রধান তপন ডেকা, আইআইটি মাদ্রাজের পরিচালক ভি. কামাকোটি, প্রাক্তন শিক্ষা সচিব অনিতা কারওয়াল এবং প্রশাসনিক ও লজিস্টিক বিশেষজ্ঞ অমৃত লাল মীনা। বিভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পরীক্ষা ব্যবস্থার একটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার রূপরেখা তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
নন্দন নিলেকানি ভারতের ডিজিটাল রূপান্তরের অন্যতম পরিচিত মুখ। আধার প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে ডিজিটাল গভর্ন্যান্সে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপদ পরীক্ষা ব্যবস্থা তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্বকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে কেন্দ্র। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা অ্যানালিটিক্স, এনক্রিপশন এবং ডিজিটাল ভেরিফিকেশন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে প্রশ্নফাঁস এবং পরীক্ষা জালিয়াতির মতো সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
এই ঘোষণার রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। সাম্প্রতিক প্রশ্নফাঁস বিতর্ক এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কেন্দ্র সরকারের ওপর চাপ বেড়েছিল। বিরোধী দলগুলি অভিযোগ করেছিল যে বর্তমান পরীক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। সেই পরিস্থিতিতেই এই টাস্ক ফোর্স গঠনের ঘোষণা এসেছে। অন্যদিকে, কংগ্রেস-সহ কয়েকটি বিরোধী দল এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধুমাত্র কঠোর আইন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পরীক্ষা পরিচালনার প্রতিটি ধাপে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল নজরদারি এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরীক্ষার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাও বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে, নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বে গঠিত এই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্ক ফোর্স দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তবে এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে কমিটির সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সেগুলির কার্যকর প্রয়োগের ওপর। আপাতত দেশের কোটি কোটি পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকের নজর এই নতুন উদ্যোগের দিকেই।


