শ্রাবণ মাসে তারকেশ্বরগামী শিবভক্তদের জন্য একাধিক নতুন উদ্যোগের ঘোষণা করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ভক্তদের যাত্রাপথকে আরও নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং স্মরণীয় করে তুলতেই এই বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এই উদ্যোগের অন্যতম আকর্ষণ হল, আবহাওয়া অনুকূল থাকলে শ্রাবণ মাসের প্রতি সোমবার তারকেশ্বরের উদ্দেশ্যে পদযাত্রায় অংশ নেওয়া ভক্তদের উপর সরকারি হেলিকপ্টার থেকে ফুলের পাপড়ি বর্ষণের পরিকল্পনা।
রাজ্য সরকারের এই ঘোষণার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। প্রতিবছর শ্রাবণ মাসে হুগলির শেওড়াফুলি থেকে গঙ্গাজল সংগ্রহ করে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথ হেঁটে লক্ষ লক্ষ ভক্ত তারকেশ্বর মন্দিরে পৌঁছে বাবা তারকনাথের মাথায় জল অর্পণ করেন। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে ভক্তদের সুবিধা নিশ্চিত করতেই এবার একাধিক বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, শুধু পুষ্পবৃষ্টি নয়, শেওড়াফুলি থেকে তারকেশ্বর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুটে নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর অন্তর সরকারি সেবাকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। সেখানে পানীয় জল, ওআরএস, বিশ্রামের ব্যবস্থা, অস্থায়ী চিকিৎসা শিবির এবং পুলিশি সহায়তা পাওয়া যাবে। এর ফলে দীর্ঘ পথ হেঁটে যাওয়া ভক্তদের শারীরিক কষ্ট অনেকটাই কমবে বলে প্রশাসনের আশা।
এছাড়াও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যাত্রাপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হবে। পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা এবং দ্রুত উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত থাকবে। বিপুল সংখ্যক ভক্তের সমাগমের কথা মাথায় রেখে জেলা প্রশাসন, পুলিশ এবং স্বাস্থ্য দফতর যৌথভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে।
রাজ্য সরকারের দাবি, অতীতে শুধুমাত্র আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার মধ্যেই প্রশাসনের ভূমিকা সীমাবদ্ধ থাকলেও এবার ধর্মীয় পর্যটন ও ঐতিহ্য রক্ষায় সরকার আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চায়। সেই লক্ষ্যেই শ্রাবণ মেলা, রথযাত্রা এবং অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন, সেবাকেন্দ্র স্থাপন এবং বিশেষ সরকারি সহায়তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তারকেশ্বর ধামকে আন্তর্জাতিক মানের তীর্থক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেও একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। মন্দির চত্বর ও আশপাশের এলাকার উন্নয়ন, যাত্রীসুবিধা বৃদ্ধি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য বিশেষ বরাদ্দের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্যের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিবমন্দিরগুলিকেও পর্যায়ক্রমে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ একদিকে যেমন ধর্মীয় পর্যটনকে উৎসাহিত করবে, তেমনি স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন শিল্পও উপকৃত হতে পারে। প্রতি বছর শ্রাবণ মাসে কয়েক লক্ষ ভক্ত তারকেশ্বরে আসেন। তাঁদের জন্য উন্নত অবকাঠামো তৈরি হলে জেলার অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে হেলিকপ্টার থেকে ফুলের পাপড়ি বর্ষণের পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে আবহাওয়ার উপর নির্ভর করবে বলে সরকার স্পষ্ট করেছে। প্রতিকূল আবহাওয়া বা নিরাপত্তাজনিত কোনও সমস্যা দেখা দিলে এই কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনা হতে পারে। প্রশাসনের মূল লক্ষ্য, যাতে ভক্তরা নির্বিঘ্নে এবং নিরাপদে তাঁদের ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করতে পারেন।
সব মিলিয়ে, শ্রাবণ মাসকে সামনে রেখে তারকেশ্বর যাত্রায় এবার ভক্তদের জন্য একাধিক নতুন পরিষেবা, উন্নত নিরাপত্তা এবং বিশেষ আয়োজনের ঘোষণা রাজ্য সরকারের ধর্মীয় পর্যটন সংক্রান্ত পরিকল্পনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এখন বাস্তবে এই উদ্যোগ কতটা সফলভাবে কার্যকর হয়, সেদিকেই নজর থাকবে ভক্ত এবং সাধারণ মানুষের।


