হুগলির তারকেশ্বর এবার হতে চলেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (RSS) গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কর্মসূচির কেন্দ্র। বাংলা ও ওড়িশার প্রচারকদের নিয়ে আগামী ১০ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর তিন দিনের একটি বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। আরএসএসের অভ্যন্তরীণ পরিভাষায় এই কর্মসূচিকে ‘প্রচারক বর্গ’ বলা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রচারকদের পাশাপাশি এবার প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার প্রচারকরাও এই কর্মশালায় অংশ নেবেন। সংগঠনের তরফে এই কর্মসূচিকে মূলত সাংগঠনিক মূল্যায়ন, প্রশিক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ কাজের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত বলে জানানো হয়েছে।
আরএসএসের সাংগঠনিক কাঠামোয় প্রচারকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠনের পূর্ণসময়ের কর্মীদের সাধারণত প্রচারক বলা হয়। তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি সাংগঠনিক দায়িত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সংঘের কাজে যুক্ত থাকেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংগঠনের কাজ বিস্তার, স্থানীয় স্তরে কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, শাখার কার্যক্রম পরিচালনা এবং নতুন কর্মী তৈরির মতো একাধিক দায়িত্ব তাঁদের উপর থাকে। ফলে প্রচারকদের নিয়ে আয়োজিত কর্মশালাগুলিকে আরএসএসের সাংগঠনিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই দেখা হয়।
প্রতিবছরই প্রচারকদের নিয়ে এই ধরনের কর্মশালা আয়োজন করে আরএসএস। সেখানে শুধু আগের বছরের কাজের হিসাব বা মূল্যায়ন নয়, ভবিষ্যতে সংগঠনের কাজ কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, তা নিয়েও আলোচনা হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রচারকদের কাজের ক্ষেত্র পরিবর্তন, নতুন দায়িত্ব দেওয়া, সাংগঠনিক কৌশল নিয়ে আলোচনা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা—এসব বিষয় কর্মসূচির অংশ হয়ে থাকে। দক্ষিণবঙ্গের প্রান্ত প্রচার প্রমুখ বিপ্লব রায় জানিয়েছেন, এই ধরনের কর্মশালায় সাংগঠনিক কৌশল নিয়ে মূল্যায়ন হয় এবং নতুন করে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়।
এবারের কর্মশালার বিশেষত্ব হল বাংলা এবং ওড়িশার প্রচারকদের একই কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসা। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ এবং মধ্যবঙ্গের প্রচারকরাও এতে অংশ নেবেন বলে জানা গিয়েছে। ফলে শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা নয়, বরং বৃহত্তর পূর্বাঞ্চলের সংগঠন কীভাবে কাজ করছে এবং আগামী দিনে কোন কোন ক্ষেত্রে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, তা নিয়েও মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হবে।
ওড়িশার প্রচারকদের অংশগ্রহণকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশা ভৌগোলিকভাবে পাশাপাশি রাজ্য। দুই রাজ্যের মধ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে সাংগঠনিক স্তরে দুই রাজ্যের কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হলে তা ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তারকেশ্বরকে এই কর্মশালার জন্য বেছে নেওয়ার বিষয়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। হুগলি জেলার এই শহর মূলত তারকনাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত। বছরের বিভিন্ন সময়ে এখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ সমবেত হন। শ্রাবণী মেলা এবং ধর্মীয় উৎসবের সময় তারকেশ্বরের ব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়। সম্প্রতি রাজ্য সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির কারণেও তারকেশ্বর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনায় এসেছে।
আরএসএসের সাংগঠনিক বিস্তার নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনা বেড়েছে। সংগঠনের দাবি অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অংশে দীর্ঘদিন ধরে শাখাভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গেও বিভিন্ন এলাকায় সংঘের কার্যক্রম রয়েছে। এবারের কর্মশালার মাধ্যমে সেই সংগঠনকে আরও সুসংবদ্ধ করার কৌশল নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও কর্মশালার বিস্তারিত আলোচ্যসূচি প্রকাশ্যে জানানো হয়নি, সংগঠনের বক্তব্য অনুযায়ী সাংগঠনিক কৌশল, দায়িত্ব বণ্টন এবং কাজের মূল্যায়নই এর মূল বিষয়।
প্রচারকদের কর্মশালায় সাধারণত মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার গুরুত্ব থাকে। কোনও এলাকায় সংগঠনের কাজ কতটা এগিয়েছে, কোথায় কর্মীর ঘাটতি রয়েছে, কোন অঞ্চলে নতুন করে সাংগঠনিক উদ্যোগ প্রয়োজন এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ বাড়ানো যায়—এসব নিয়ে আলোচনা হতে পারে। পাশাপাশি সংগঠনের কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং দায়িত্ব পালনের পদ্ধতিও আলোচনায় আসতে পারে।
এই কর্মশালার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল নতুন দায়িত্ব বণ্টন। আরএসএসের প্রচারকরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেন। সংগঠনের প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁদের কাজের ক্ষেত্র বদলানো হতে পারে। নতুন এলাকায় দায়িত্ব দেওয়া হলে সেখানে সংগঠনের কার্যক্রম কীভাবে গড়ে তোলা হবে, স্থানীয় স্তরে কারা নেতৃত্ব দেবেন এবং সাংগঠনিক কাঠামো কীভাবে শক্তিশালী করা হবে—এসব বিষয় নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আরএসএসের কার্যক্রম নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আগ্রহ আরও বেড়েছে। সংগঠনটি সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নেয় না বলে দাবি করলেও, বিজেপির সঙ্গে আরএসএসের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ও আদর্শগত সম্পর্ক রয়েছে। সেই কারণে রাজ্যে আরএসএসের কোনও বড় সাংগঠনিক কর্মসূচি হলেই তার রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে এবারের কর্মশালাকে আরএসএস মূলত তাদের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক কার্যক্রম হিসেবেই দেখছে।
এদিকে ওড়িশার প্রচারকদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও পূর্বাঞ্চলে সংগঠনের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয়ের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও কর্মশালায় ঠিক কতজন প্রচারক উপস্থিত থাকবেন, তাঁদের নাম বা নির্দিষ্ট সেশন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি। সংগঠনের তরফে শুধু জানানো হয়েছে, বাংলা ও ওড়িশার প্রচারকদের নিয়ে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।
আরএসএসের দক্ষিণবঙ্গের প্রান্ত প্রচার প্রমুখ বিপ্লব রায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রচারকদের নিয়ে প্রতিবছরই এই ধরনের কর্মশালা হয়। সেখানে আগের কাজের মূল্যায়নের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। অর্থাৎ তারকেশ্বরের তিন দিনের কর্মসূচিকে কোনও একক রাজনৈতিক সভা হিসেবে নয়, বরং সংগঠনের নিয়মিত সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এবারের কর্মশালার সময়কাল এবং অংশগ্রহণকারীদের পরিধি রাজনৈতিক দিক থেকেও নজর কাড়ছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশার প্রচারকদের একই মঞ্চে নিয়ে আসার ফলে দুই রাজ্যের সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী দিনে কোন অঞ্চলে সংগঠনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে, কী ধরনের সাংগঠনিক কর্মসূচি নেওয়া হবে কিংবা নতুন কর্মীদের কীভাবে যুক্ত করা হবে—এসব বিষয় নিয়ে পরিকল্পনা তৈরি হতে পারে।
তারকেশ্বরে এর আগে কেন্দ্র ও রাজ্যস্তরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিও হয়েছে। চলতি বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারকেশ্বরে পশ্চিমবঙ্গ দিবসের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। সেই সময়ও এলাকা ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
সুতরাং সেপ্টেম্বরের আরএসএস কর্মশালাকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক কৌতূহল তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। যদিও কর্মসূচিটি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নকেন্দ্রিক, তবু পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এর প্রতিটি সাংগঠনিক পদক্ষেপের দিকেই নজর রয়েছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।
সব মিলিয়ে, ১০ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর তারকেশ্বরে আয়োজিত হতে চলা আরএসএসের ‘প্রচারক বর্গ’ কর্মশালা সংগঠনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক আয়োজন। বাংলা ও ওড়িশার প্রচারকদের একত্রিত করে কাজের মূল্যায়ন, নতুন দায়িত্ব বণ্টন এবং ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কৌশল নিয়ে আলোচনা হবে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর, দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের প্রচারকদের উপস্থিতির পাশাপাশি ওড়িশার প্রচারকদের অংশগ্রহণ এই কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত মাত্রা দিচ্ছে। এখন দেখার, তিন দিনের এই কর্মশালা শেষে বাংলার সাংগঠনিক ক্ষেত্রে কী নতুন নির্দেশনা বা দায়িত্ব বণ্টনের সিদ্ধান্ত সামনে আসে।


