দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে বড় পদক্ষেপের কথা ভাবছে কেন্দ্র সরকার। জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ **হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, সিগন্যাল**-সহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের জন্য একটি অভিন্ন নিয়ন্ত্রক কাঠামো (Uniform Regulatory Framework) তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করছে কেন্দ্রীয় সরকার। মূল লক্ষ্য হল সাইবার প্রতারণা, পরিচয় গোপন করে অপরাধ, ফিশিং এবং ভুয়ো অ্যাকাউন্টের ব্যবহার রোধ করা। প্রস্তাবিত নিয়ম কার্যকর হলে কোটি কোটি ভারতীয় ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন মেসেজিং ব্যবস্থায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।
সরকারি সূত্রের খবর, ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক (MeitY) বিভিন্ন মেসেজিং প্ল্যাটফর্মের জন্য একরকম নিয়ম চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। বিশেষ করে ব্যবহারকারীর পরিচয় যাচাই, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্ল্যাটফর্মে অজ্ঞাত পরিচয়ে যোগাযোগের সুযোগ নিয়ে সরকারের উদ্বেগ বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে হোয়াটসঅ্যাপের নতুন **Username Feature** নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কেন্দ্র। সরকারের আশঙ্কা, ফোন নম্বর প্রকাশ না করেও যোগাযোগের সুযোগ থাকলে প্রতারকরা সাধারণ মানুষকে সহজেই টার্গেট করতে পারে।
জানা গিয়েছে, প্রস্তাবিত নিয়মের অন্যতম উদ্দেশ্য হল প্রতিটি ব্যবহারকারীর পরিচয় আরও নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা। এর ফলে অনলাইন প্রতারণা, ভুয়ো অ্যাকাউন্ট ব্যবহার এবং সাইবার অপরাধ মোকাবিলা সহজ হবে বলে মনে করছে সরকার। একই সঙ্গে বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপের জন্য আলাদা আলাদা নিয়মের পরিবর্তে একটি অভিন্ন নীতি কার্যকর করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম এবং অন্যান্য এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ কোটি কোটি মানুষ ব্যবহার করেন। ব্যক্তিগত যোগাযোগ থেকে শুরু করে ব্যবসা, শিক্ষা, সরকারি পরিষেবা—সব ক্ষেত্রেই এই অ্যাপগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নতুন কোনও নিয়ম চালু হলে তার প্রভাবও হবে ব্যাপক। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
এদিকে, সরকার ইতিমধ্যেই টেলিকম সাইবার সিকিউরিটি সংক্রান্ত কিছু নিয়ম কার্যকর করেছে, যার আওতায় নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে **SIM Binding**-এর মতো ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এর ফলে নিবন্ধিত সিমের সঙ্গে অ্যাপ ব্যবহারের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবিত কাঠামো সেই নীতিকে আরও বিস্তৃত করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকারের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন জালিয়াতি, ডিজিটাল প্রতারণা এবং পরিচয় গোপন করে অপরাধের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বহু ক্ষেত্রে অপরাধীরা এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে। তাই প্রযুক্তির অপব্যবহার রুখতে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করছে প্রশাসন।
অন্যদিকে, প্রযুক্তি সংস্থাগুলির একাংশ এবং ডিজিটাল অধিকার কর্মীরা বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের মতে, ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা এবং End-to-End Encryption বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নিয়ম প্রয়োগের সময় যাতে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
হোয়াটসঅ্যাপের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, তাদের নতুন Username ফিচারে একাধিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সংস্থার দাবি, ব্যবহারকারীকে অ্যাকাউন্ট খুলতে এখনও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করতেই হবে এবং অচেনা ব্যক্তিরা সহজে যোগাযোগ করতে পারবেন না। পাশাপাশি প্রতারণা রুখতে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থাও যুক্ত করা হয়েছে।
তবে এখনও পর্যন্ত কেন্দ্র সরকার এই নতুন নিয়ম সম্পর্কে কোনও চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করেনি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক, প্রযুক্তি সংস্থা এবং অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আলোচনার ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে, দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে কেন্দ্র সরকার যে নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কথা ভাবছে, তা আগামী দিনে হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম এবং অন্যান্য মেসেজিং প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। তবে নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


