দেশজুড়ে নারীদের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এবার স্কুল স্তর থেকেই কিশোরীদের **হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV)**-এর বিরুদ্ধে টিকাকরণের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট বয়সের ছাত্রীদের স্কুলেই স্বাস্থ্যকর্মীদের তত্ত্বাবধানে টিকা দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প বয়সে এই টিকা গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে জরায়ুমুখ ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ভারতের জাতীয় HPV টিকাকরণ কর্মসূচিও কিশোরীদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে নারীদের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যানসার অন্যতম সাধারণ ক্যানসার হিসেবে বিবেচিত হয়। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগের প্রধান কারণ হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস বা HPV-এর সংক্রমণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ভাইরাসের সংক্রমণ দীর্ঘদিন শরীরে থেকে ভবিষ্যতে ক্যানসারের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তবে সময়মতো টিকাকরণ করলে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সরকারি স্বাস্থ্য দফতরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্কুলের মাধ্যমেই টিকাকরণ কর্মসূচি পরিচালনা করলে অনেক বেশি সংখ্যক কিশোরীর কাছে সহজে পৌঁছনো যাবে। পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। স্বাস্থ্যকর্মীরা স্কুলে গিয়ে টিকার প্রয়োজনীয়তা, উপকারিতা এবং সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবেন। এর ফলে টিকা নিয়ে অযথা ভয় বা বিভ্রান্তিও অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, HPV টিকা শুধুমাত্র জরায়ুমুখ ক্যানসারের ঝুঁকি কমায় না, ভাইরাসজনিত আরও কিছু গুরুতর রোগের বিরুদ্ধেও সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা বহু বছর ধরেই নির্দিষ্ট বয়সে এই টিকা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছে। সেই কারণেই বিশ্বের বহু দেশে স্কুলভিত্তিক টিকাকরণ কর্মসূচি সফলভাবে চালু রয়েছে।
ভারতেও জাতীয় স্তরে এইচপিভি টিকাকরণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে নির্দিষ্ট বয়সের কিশোরীদের বিনামূল্যে টিকা দেওয়া হচ্ছে। এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১.১৫ কোটিরও বেশি উপযুক্ত বয়সের মেয়েকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশাপাশি স্কুলের মাধ্যমেও টিকাকরণ সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য দফতরের একাংশের মতে, অনেক সময় পরিবারের ব্যস্ততা বা সচেতনতার অভাবে অনেকেই সময়মতো টিকা নিতে পারেন না। স্কুলে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে সেই সমস্যা অনেকটাই দূর হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতিতেই টিকাকরণ সম্পন্ন হবে। টিকা দেওয়ার আগে অভিভাবকদের সম্মতিও নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, HPV টিকা নেওয়ার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনও গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। সামান্য জ্বর, ইনজেকশনের জায়গায় ব্যথা বা অস্বস্তির মতো হালকা উপসর্গ কিছু সময়ের জন্য হতে পারে, যা সাধারণত দ্রুত সেরে যায়। তাই অযথা গুজব বা ভুল তথ্যের পরিবর্তে চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে টিকা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র টিকাকরণই নয়, জরায়ুমুখ ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিংও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে এই রোগের প্রকোপ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
স্কুলভিত্তিক HPV টিকাকরণ কর্মসূচি চালু হলে একদিকে যেমন কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা আরও জোরদার হবে, তেমনই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি প্রতিরোধযোগ্য ক্যানসারের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশা, এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে জরায়ুমুখ ক্যানসারের হার ধীরে ধীরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে।


