Home বাংলা ভোটার তালিকা ও রেশন ডেটায় ৬২ হাজার নামের গরমিল

ভোটার তালিকা ও রেশন ডেটায় ৬২ হাজার নামের গরমিল

0
2

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন ও তথ্য যাচাইকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনা। এবার কোচবিহার জেলায় ভোটার তালিকা এবং রেশন কার্ডের তথ্য মিলিয়ে দেখার সময় সামনে এসেছে একটি বড় ধরনের অসঙ্গতি। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, জেলার ভোটার তালিকায় থাকা **প্রায় ৬২ হাজার মানুষের নাম রাজ্যের ডিজিটাল রেশন কার্ড ডেটাবেসে খুঁজে পাওয়া যায়নি**। এই তথ্য সামনে আসতেই শুরু হয়েছে ব্যাপক যাচাই-বাছাই, পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলেও তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।

জানা গিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী ভোটার তালিকাকে আরও নির্ভুল ও হালনাগাদ করতে বিভিন্ন সরকারি তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখার প্রক্রিয়া চলছে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই কোচবিহার জেলার ভোটার তালিকার তথ্য রাজ্যের রেশন কার্ড ডেটাবেসের সঙ্গে তুলনা করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ের এই যাচাইয়ে দেখা যায়, ভোটার তালিকায় থাকা প্রায় ৬২ হাজার নামের সঙ্গে রেশন ডেটাবেসে কোনও মিল পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে প্রশাসনের একাংশ স্পষ্ট জানিয়েছে, **রেশন কার্ড ডেটাবেসে নাম না থাকলেই কোনও ব্যক্তি অবৈধ ভোটার—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না।** কারণ অনেক নাগরিকের পারিবারিক, আর্থিক কিংবা প্রশাসনিক কারণে রেশন কার্ড নাও থাকতে পারে। আবার কেউ অন্য জেলার রেশন কার্ড ব্যবহার করতে পারেন, কারও নাম এখনও ডিজিটাল ডেটাবেসে আপডেট না-ও হতে পারে। ফলে প্রতিটি ক্ষেত্রে পৃথকভাবে তদন্ত ও নথি যাচাই করা হবে।

জেলা প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য পুনরায় যাচাই করতে বুথ লেভেল অফিসার (BLO)-দের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি সমীক্ষার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভোটারদের পরিচয়, ঠিকানা, নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য সরকারি নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। কোথাও যদি তথ্যগত ভুল থাকে, তা সংশোধনের সুযোগও দেওয়া হবে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগ, ভোটার তালিকায় ভুয়ো নাম বা অযোগ্য ভোটারের উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছিল। তাদের দাবি, এই ধরনের অসঙ্গতি সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরদার করছে। অন্যদিকে শাসকদলের বক্তব্য, শুধুমাত্র রেশন ডেটাবেসে নাম না থাকার ভিত্তিতে ভোটারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা ঠিক নয়। প্রশাসনিক তথ্যভাণ্ডারে বিভিন্ন কারণে গরমিল থাকতে পারে এবং সঠিক তদন্তের পরেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

নির্বাচনী বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটার তালিকা প্রস্তুতের ক্ষেত্রে একাধিক সরকারি ডেটাবেস ব্যবহার করা হলেও প্রত্যেকটির উদ্দেশ্য আলাদা। ভোটার তালিকা নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত আইন অনুযায়ী তৈরি হয়, অন্যদিকে রেশন কার্ড সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের জন্য। ফলে দুটি তালিকার মধ্যে সম্পূর্ণ মিল না থাকাটাই অস্বাভাবিক নয়। তবে বড় সংখ্যায় তথ্যের অমিল সামনে এলে তা অবশ্যই যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমানে এটি শুধুমাত্র **প্রাথমিক ডেটা যাচাইয়ের ফলাফল**। এখনই কোনও ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া বা তাঁর ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ভোটারদের নোটিস পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল ডেটাবেসের যুগে বিভিন্ন সরকারি তথ্যভাণ্ডারের মধ্যে তথ্যের সামঞ্জস্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে ভুয়ো নথি শনাক্ত করা যেমন সহজ হয়, তেমনই প্রকৃত নাগরিকদের তথ্যও আরও নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। তবে এই ধরনের যাচাই প্রক্রিয়ায় যাতে কোনও বৈধ ভোটার হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

আগামী দিনে কোচবিহারের এই তথ্য যাচাইয়ের ফলাফল রাজ্যের অন্যান্য জেলাতেও একই ধরনের যাচাই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রশাসনের দাবি, স্বচ্ছ, নির্ভুল এবং হালনাগাদ ভোটার তালিকা তৈরির লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন নজর থাকবে যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর প্রকৃতপক্ষে কতগুলি ক্ষেত্রে তথ্যগত অসঙ্গতি প্রমাণিত হয় এবং তার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here