তৃণমূল কংগ্রেসের প্রকৃত বা ‘আসল’ সংগঠন কোনটি—এই প্রশ্ন ঘিরে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আরও তীব্র হয়েছে। সেই আবহেই নির্বাচন কমিশনের কাছে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে বিস্তারিত নথি ও যুক্তি জমা দিল কলিঘাট শিবির। তাদের দাবি, সংগঠনের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শুরু করে দলীয় সংবিধান, সাংগঠনিক কাঠামো, নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং কর্মীদের সমর্থনের নিরিখে তারাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস। কমিশনের কাছে সেই দাবির পক্ষে একাধিক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
সূত্রের খবর, নির্বাচন কমিশন দুই পক্ষকেই নিজেদের দাবি এবং পাল্টা দাবি জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। সেই নির্দেশ মেনেই কলিঘাট শিবির নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমস্ত নথি কমিশনের হাতে তুলে দেয়। এই নথিতে দলীয় সংবিধান, সাংগঠনিক নির্বাচন, অনুমোদিত পদাধিকারী এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সংক্রান্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কলিঘাট শিবিরের বক্তব্য, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলের মূল আদর্শ, সাংগঠনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। তাঁদের দাবি, বর্তমান নেতৃত্বই সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে এবং অধিকাংশ জেলা ও ব্লক স্তরের সংগঠন এখনও এই নেতৃত্বের প্রতিই আস্থা রেখেছে। তাই আইনগত ও সাংগঠনিক উভয় দিক থেকেই তারাই দলের প্রকৃত উত্তরাধিকারী।নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে দলের জাতীয় কার্যকরী সমিতি, অনুমোদিত পদাধিকারী এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্তগুলি সংবিধান মেনেই গৃহীত হয়েছে। ফলে অন্য কোনও গোষ্ঠীর দাবি গ্রহণযোগ্য হওয়ার সুযোগ নেই বলেই মত কলিঘাট শিবিরের।
অন্যদিকে বিরোধী শিবিরও নির্বাচন কমিশনের কাছে নিজেদের দাবি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, সংগঠনের বৃহত্তর অংশের সমর্থন তাদের সঙ্গেই রয়েছে এবং সেই কারণেই তারাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। কমিশনের কাছে দুই পক্ষই সাংগঠনিক শক্তি, নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং দলীয় কাঠামোর ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল দলীয় নির্বাচনী প্রতীক এবং আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। নির্বাচন কমিশন যদি মনে করে যে বিরোধ যথেষ্ট গভীর এবং দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব নয়, তাহলে ভবিষ্যতের নির্বাচনের আগে প্রতীক নিয়ে আলাদা সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনও কমিশনের তরফে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন কমিশন সাধারণত এই ধরনের বিরোধের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়। এর মধ্যে রয়েছে সাংগঠনিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমর্থন, দলীয় সংবিধান মেনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পূর্ববর্তী সাংগঠনিক নথিপত্র। উভয় পক্ষের জমা দেওয়া তথ্য যাচাই করেই কমিশন পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
এদিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিরোধ শুধু একটি দলের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এর প্রভাব আগামী দিনের রাজ্য রাজনীতিতেও পড়তে পারে। কারণ নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে কোন পক্ষ দলীয় নাম ও প্রতীক ব্যবহারের অধিকার পাবে। সেই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের নির্বাচনী কৌশল এবং রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ভূমিকা নিতে পারে।
কলিঘাট শিবির অবশ্য আত্মবিশ্বাসী। তাদের দাবি, সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি এবং আইনি ভিত্তি কমিশনের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত তৃণমূল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা আশাবাদী। অন্যদিকে প্রতিপক্ষও নিজেদের দাবিতে অনড়। ফলে এখন সবার নজর নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে।
রাজনৈতিক মহলের ধারণা, দুই পক্ষের জমা দেওয়া নথি, সাংগঠনিক তথ্য এবং আইনি ব্যাখ্যা খতিয়ে দেখে কমিশন শুনানির পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। সেই সিদ্ধান্ত শুধু দলীয় পরিচয় নয়, ভবিষ্যতের নির্বাচনী প্রতীক, সাংগঠনিক বৈধতা এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির গতিপথেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।


