বারুইপুরের নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যুর পর তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। পুলিশের এনকাউন্টারে মৃত্যুর পর তাঁর দেহের ময়নাতদন্তের আগে বিশেষভাবে ডিজিটাল এক্স-রে করা হয়। ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপ শুধু তদন্তের স্বচ্ছতা বাড়াতেই নয়, ভবিষ্যতে কোনও ধরনের আইনি বিতর্ক এড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে বুলেটজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের আগে এভাবে এক্স-রে করার ঘটনা এই প্রথম বলেই দাবি করা হচ্ছে।
ঘটনার পর প্রভাস মণ্ডলের দেহ কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ময়নাতদন্ত শুরুর আগে কিছু সময় দেহটি সংরক্ষণ করার পর ডিজিটাল এক্স-রে ইউনিটে পাঠানো হয়। ফরেন্সিক তদন্তে এই ধাপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এক্স-রের মাধ্যমে শরীরের ভিতরে বুলেট রয়েছে কি না, থাকলে সেটি ঠিক কোন স্থানে রয়েছে, তা স্পষ্টভাবে জানা সম্ভব হয়। এর ফলে ময়নাতদন্তের সময় চিকিৎসকদের কাজ অনেক বেশি নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই এক্স-রে করার পিছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ভবিষ্যতে কেউ যাতে অভিযোগ করতে না পারেন যে মৃত্যুর পরে মৃতদেহে বুলেট প্রবেশ করানো হয়েছে, সেই সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে নাকচ করার জন্য আগে থেকেই সমস্ত প্রমাণ নথিভুক্ত করা হয়। দ্বিতীয়ত, যদি বুলেট শরীরের ভিতরে থেকে থাকে, তাহলে তার সঠিক অবস্থান আগেই জানা গেলে ময়নাতদন্তে তা উদ্ধার করা সহজ হয় এবং প্রমাণ সংগ্রহ আরও বৈজ্ঞানিকভাবে করা যায়। এই পদ্ধতি আদালতে ফরেন্সিক প্রমাণকে আরও শক্তিশালী করে তুলতেও সাহায্য করে।
ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানিয়েছেন, দেশের রাজস্থান, পাঞ্জাব, হরিয়ানা-সহ একাধিক রাজ্যে বহুদিন ধরেই বুলেট ইনজুরির ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের আগে এক্স-রে করার প্রচলন রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও সেই আধুনিক ফরেন্সিক পদ্ধতি এবার অনুসরণ করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এর ফলে তদন্তের প্রতিটি ধাপ বৈজ্ঞানিকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যতে বিচার প্রক্রিয়ায় তা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
উল্লেখ্য, বারুইপুরের বহুল আলোচিত নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় প্রভাস মণ্ডলকে প্রথমদিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য গভীর রাতে তাঁকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযোগ, সেই সময় তিনি এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলিও চালান। এরপর আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়। সেই গুলিতেই গুরুতর আহত হন প্রভাস। পরে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই ঘটনার পর থেকেই এনকাউন্টার নিয়ে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রভাসের মৃত্যুর পর তাঁর দেহের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিয়ে প্রশাসন যে বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে, তা থেকেই স্পষ্ট যে তদন্তে কোনও ধরনের ফাঁক রাখতে চাইছে না কর্তৃপক্ষ। এক্স-রে রিপোর্ট, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, বুলেট উদ্ধার এবং ব্যালিস্টিক পরীক্ষার ফল—সবকিছু মিলিয়েই পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এগোবে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে নথিভুক্ত করা হলে ভবিষ্যতে কোনও আইনি জটিলতা বা প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যাবে।
এই ঘটনাকে ঘিরে রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। একদিকে পুলিশ দাবি করছে, অভিযুক্ত আত্মরক্ষার পরিস্থিতি তৈরি করেছিল বলেই পাল্টা গুলি চালাতে হয়। অন্যদিকে, বিরোধী মহলের একাংশ এনকাউন্টারের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি তুলেছে। তবে তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য, সমস্ত প্রক্রিয়া আইন মেনেই সম্পন্ন হয়েছে এবং ফরেন্সিক পরীক্ষার প্রতিটি ধাপের নথি সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গে বুলেটজনিত মৃত্যুর তদন্তে এই ধরনের প্রি-অটপসি এক্স-রে নিয়মিত প্রয়োগ করা হলে তদন্ত আরও নির্ভুল ও স্বচ্ছ হবে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন প্রমাণ সংরক্ষণকে সহজ করে, তেমনই আদালতে বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্য উপস্থাপনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বারুইপুর মামলায় এই পদক্ষেপকে শুধু একটি তদন্ত প্রক্রিয়া নয়, বরং ফরেন্সিক ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের দিকেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।


