দেশে ক্রমবর্ধমান সাইবার প্রতারণা, ফিশিং এবং ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ কেলেঙ্কারির মধ্যে এবার জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ **টেলিগ্রাম (Telegram)** এবং **সিগন্যাল (Signal)**-কে নোটিস পাঠাল কেন্দ্রীয় সরকার। এর আগে একই ধরনের নোটিস পাঠানো হয়েছিল **মেটা (Meta)**-র মালিকানাধীন **হোয়াটসঅ্যাপ (WhatsApp)**-কে। এবার সরকারের নজরে এসেছে টেলিগ্রাম ও সিগন্যালের **Username Feature**, যার মাধ্যমে মোবাইল নম্বর প্রকাশ না করেই ব্যবহারকারীরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
কেন্দ্রের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক (MeitY)-এর দাবি, এই ফিচার ব্যবহার করে প্রতারকরা সহজেই ভুয়ো পরিচয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। ফলে অনলাইন প্রতারণা, পরিচয় জালিয়াতি এবং ফিশিংয়ের মতো অপরাধের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। সেই কারণেই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে এবং কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তারা গ্রহণ করেছে, তার বিস্তারিত রিপোর্টও চাওয়া হয়েছে।
কেন উদ্বিগ্ন কেন্দ্র?বর্তমানে বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপে ইউজারনেম ব্যবহার করে ফোন নম্বর গোপন রাখা যায়। এই সুবিধার ফলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা যেমন বাড়ে, তেমনি অসাধু ব্যক্তিরাও ভুয়ো পরিচয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে বলে আশঙ্কা সরকারের।বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল অ্যারেস্ট, ব্যাঙ্ক জালিয়াতি, কেওয়াইসি আপডেটের নামে প্রতারণা এবং সরকারি আধিকারিক সেজে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা বেড়েছে। সরকারের মতে, ইউজারনেমভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এই ধরনের অপরাধ আরও সহজ করে দিতে পারে।
টেলিগ্রাম ও সিগন্যালকে কী জানতে চেয়েছে সরকার?সরকারি সূত্র অনুযায়ী, MeitY টেলিগ্রাম ও সিগন্যালকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলেছে—
* ইউজারনেম ব্যবহারে প্রতারণা রোধে কী ব্যবস্থা রয়েছে?
* ভুয়ো পরিচয় বা ইমপারসোনেশন কীভাবে আটকানো হয়?
* অভিযোগ পেলে কত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়?
* ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে?
এছাড়াও টেলিগ্রামের ক্ষেত্রে সরকার জানতে চেয়েছে, এই ফিচার চালু রাখার যৌক্তিকতা কী।
হোয়াটসঅ্যাপের পর এবার টেলিগ্রাম ও সিগন্যালকয়েকদিন আগেই কেন্দ্র হোয়াটসঅ্যাপকে তাদের প্রস্তাবিত ইউজারনেম ফিচার ভারতে চালু না করার নির্দেশ দিয়েছিল। পাশাপাশি তিন দিনের মধ্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা জমা দিতে বলা হয়। সরকারের দাবি ছিল, এই ফিচার চালু হলে সাইবার অপরাধের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
এবার একই ধরনের নজরদারির আওতায় এসেছে টেলিগ্রাম ও সিগন্যাল, যেখানে ইউজারনেম ফিচার ইতিমধ্যেই উপলব্ধ।
অ্যাপগুলির প্রতিক্রিয়াসংবাদ প্রকাশ পর্যন্ত টেলিগ্রাম ও সিগন্যালের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। অন্যদিকে, হোয়াটসঅ্যাপ জানিয়েছে যে তাদের প্রস্তাবিত ইউজারনেম ফিচারে একাধিক নিরাপত্তা স্তর রাখা হয়েছে, যাতে ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার, স্প্যাম এবং প্রতারণা রোধ করা যায়।
ব্যবহারকারীদের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
বর্তমানে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য টেলিগ্রাম বা সিগন্যাল ব্যবহারে কোনও নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। তবে সরকার যদি ভবিষ্যতে নতুন নির্দেশিকা জারি করে, তাহলে ইউজারনেম ফিচারের ব্যবহার বা এর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের মূল উদ্দেশ্য ফিচার বন্ধ করা নয়, বরং এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাতে অপরাধীরা এই সুবিধার অপব্যবহার করতে না পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই পদক্ষেপ?ভারতে বর্তমানে অনলাইন প্রতারণার ঘটনা দ্রুত বাড়ছে। প্রতারকরা কখনও ব্যাঙ্ককর্মী, কখনও পুলিশ, আবার কখনও সরকারি আধিকারিক সেজে মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিচয় গোপন রেখে যোগাযোগের সুযোগ থাকলে সেই অপব্যবহার আরও বাড়তে পারে বলে সরকারের আশঙ্কা।
অন্যদিকে, গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে অনেক ব্যবহারকারী ইউজারনেমভিত্তিক যোগাযোগকে সমর্থন করেন। ফলে নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
শেষ কথামেটার পর এবার টেলিগ্রাম ও সিগন্যালকে নোটিস পাঠিয়ে কেন্দ্র স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলির নতুন ফিচার নিয়ে সরকার আরও সতর্ক অবস্থান নিতে চলেছে। আগামী দিনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির জবাব এবং সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে ইউজারনেম ফিচারের ভবিষ্যৎ। আপাতত ব্যবহারকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই, তবে সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং অপরিচিত ইউজারনেম থেকে আসা বার্তা যাচাই করে তবেই সাড়া দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।


