সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ‘বাঘ বিধবা’দের কাজ এবার পৌঁছে গেল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রশংসার তালিকায়। রবিবার ১৩৮তম ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে সুন্দরবনের ঝড়খালির সেই মহিলাদের উদ্যোগের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সুন্দরবনের প্রকৃত রক্ষক স্থানীয় মানুষরাই, আর তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই এমন মহিলা, যাঁরা বাঘের আক্রমণে স্বামীকে হারিয়েছেন। আজ সেই নারীরাই ম্যানগ্রোভ বন গড়ে তুলে সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ রক্ষা করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে পরিবেশ সংরক্ষণ, মানবিক সংগ্রাম এবং নারীশক্তির এক অনন্য মেলবন্ধন। তাঁর এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর ঝড়খালির ‘বাঘ বিধবা’ পরিবারগুলির মধ্যে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বহু বছর ধরে নীরবে কাজ করে চলা এই নারীরা মনে করছেন, তাঁদের সংগ্রাম এবার জাতীয় স্তরে স্বীকৃতি পেল।
### কারা এই ‘বাঘ বিধবা’?
সুন্দরবনের বহু পরিবার জীবিকার জন্য মাছ ধরা, কাঁকড়া সংগ্রহ কিংবা মধু আহরণের উদ্দেশ্যে জঙ্গলে প্রবেশ করেন। সেই বনেই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের হামলায় প্রতিবছর বহু মানুষের প্রাণ যায়। যেসব নারী এই হামলায় স্বামীকে হারিয়েছেন, তাঁদের স্থানীয়ভাবে ‘বাঘ বিধবা’ বলা হয়।
স্বামীকে হারানোর পর তাঁদের অনেকের জীবনে নেমে আসে আর্থিক সংকট, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং নানা ধরনের বঞ্চনা। কিন্তু সেই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও ঝড়খালির একদল মহিলা নিজেদের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ ও বন পুনরুদ্ধারের কাজে যুক্ত হয়েছেন।
### প্রধানমন্ত্রীর কী বার্তা?
‘মন কি বাত’-এ নরেন্দ্র মোদি বলেন, “সুন্দরবনের মানুষরাই সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম তৈরি করছেন। স্থানীয় মানুষরাই ম্যানগ্রোভ লাগাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই মহিলা, আর তাঁদের অনেকেই বাঘ বিধবা।”
তিনি আরও বলেন, “সুন্দরবনে মাছ বা কাঁকড়া ধরতে যাওয়া তাঁদের স্বামীদের বাঘ টেনে নিয়ে গেছে। অথচ আজ তাঁরাই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে এসেছেন ম্যানগ্রোভ রক্ষা করতে। আমরা যখন পরিবেশ রক্ষা করি, তখন শুধু একটি কাজ করি না, পুরো ইকোসিস্টেমকে রক্ষা করি।”
### কেন গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন শুধু রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল নয়, উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক ঢালও। এই বন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের প্রভাব অনেকটাই কমাতে সাহায্য করে।
ম্যানগ্রোভের জটিল শিকড় মাটি শক্ত করে ধরে রাখে, ক্ষয় রোধ করে এবং মাছ, কাঁকড়া-সহ বহু জলজ প্রাণীর প্রজননের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে। ফলে এই বন রক্ষা করা মানে শুধু বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ নয়, লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তাকেও সুরক্ষিত রাখা।
### এক লক্ষ চারা রোপণের লক্ষ্য
ঝড়খালিতে এই মহিলাদের নেতৃত্বে প্রায় ১০০ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত ম্যানগ্রোভ এলাকা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁদের লক্ষ্য এক লক্ষ ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ করা।
এই উদ্যোগে শুধু ‘বাঘ বিধবা’রাই নন, এলাকার আরও বহু মহিলা যুক্ত হয়েছেন। প্রতিটি চারা রোপণের মাধ্যমে তাঁরা এমন এক বন গড়ে তুলতে চাইছেন, যা ভবিষ্যতে মানুষ ও বন্যপ্রাণ—উভয়ের জন্যই নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করবে।
### সুন্দরবনের বাস্তব চিত্র
প্রতি বছর সুন্দরবনে বাঘের হামলায় একাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতিপূরণ পেতে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য তাঁদের কাছে নতুন আশার আলো হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় পরিবারগুলির একাংশের মতে, জাতীয় স্তরে তাঁদের কাজের স্বীকৃতি মিললে ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তা, সংরক্ষণ প্রকল্প এবং জীবিকার বিকল্প সুযোগ আরও বাড়তে পারে।
### ‘মন কি বাত’-এ পরিবেশের আরও উদাহরণ
সুন্দরবনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী অসমের সোনাই-রূপাই অঞ্চলের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগে অধিগৃহীত জমি পুনরুদ্ধারের পর সেখানে আবার হাতির দল ফিরে এসেছে। এই উদাহরণ টেনে তিনি বোঝাতে চান, প্রকৃতির পুনরুদ্ধারে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
### নারীদের সংগ্রাম থেকে পরিবেশের অনুপ্রেরণা
ঝড়খালির এই নারীদের গল্প শুধু ব্যক্তিগত সংগ্রামের নয়, বরং পরিবেশ সংরক্ষণেরও এক শক্তিশালী বার্তা বহন করে। যে বন একদিন তাঁদের কাছ থেকে প্রিয়জনকে কেড়ে নিয়েছিল, সেই বনকেই আজ তাঁরা নতুন করে গড়ে তুলছেন। তাঁদের হাতে রোপিত প্রতিটি ম্যানগ্রোভ চারা সুন্দরবনের ভবিষ্যৎকে আরও সুরক্ষিত করার পাশাপাশি মানবিক সাহস, আত্মনির্ভরতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।


