বলিউড অভিনেতা **সিদ্ধার্থ মালহোত্র** এবং **তমান্না ভাটিয়া** অভিনীত আসন্ন ছবি **‘The Vvaan: Force of the Forest’** মুক্তির আগেই দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছে। রহস্যময় জঙ্গল, অলৌকিক শক্তি এবং বনদেবীর কিংবদন্তিকে কেন্দ্র করে তৈরি ছবিটির ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই আলোচনায় উঠে এসেছে বিহারের প্রায় **৪০০ বছরের পুরনো বনদেবী মন্দির**। পাটনা জেলার বিহটা এলাকার এই মন্দিরকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আজও নানা বিশ্বাস, লোককথা এবং অলৌকিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে।
### তিন গ্রামের সীমানায় ঘেরা রহস্যময় মন্দির
মা বনদেবীর এই প্রাচীন মন্দিরটি বিহারের পাটনা জেলার **বিহটা** শহরের কাছে অবস্থিত। বিশেষত্ব হল, এটি **আমহারা, রাঘোপুর এবং কাঞ্চনপুর**—এই তিনটি গ্রামের সীমান্তবর্তী ঘন জঙ্গলের মধ্যে গড়ে উঠেছে। সাধারণ মন্দিরের মতো এখানে বিশাল গর্ভগৃহ বা অলংকৃত স্থাপত্য নেই। বরং একটি **পবিত্র পিণ্ড**-এর মাধ্যমেই দেবীর পূজা করা হয়, যা এই মন্দিরকে অন্য সব মন্দিরের থেকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
### স্বপ্নাদেশ থেকেই নাকি সূচনা
স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, প্রায় চারশো বছর আগে **বিদ্যানন্দ মিশ্র** নামে এক ভক্ত প্রতিদিন উত্তরপ্রদেশের বিখ্যাত **মা বিন্ধ্যবাসিনী ধাম**-এ পূজা দিতে যেতেন। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। তখনই এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেবীর দর্শন পান। কথিত আছে, দেবী তাঁকে নির্দেশ দেন নিজের গ্রামের কাছে তাঁর শক্তির প্রতীক একটি পবিত্র পিণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে। সেই স্বপ্নাদেশ মেনেই বিদ্যানন্দ মিশ্র এই জঙ্গলের মধ্যে দেবীর পিণ্ড প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকেই স্থানটি ‘মা বনদেবী মন্দির’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
### সূর্যাস্তের পর কেন নিষিদ্ধ প্রবেশ?
এই মন্দিরকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত বিশ্বাস হল— **সূর্য ডোবার পর মন্দির চত্বরে প্রবেশ করা উচিত নয়।** স্থানীয়দের মতে, রাতের অন্ধকারে দেবী নিজেই বনভূমিতে বিচরণ করেন এবং বনজ প্রাণী ও প্রকৃতির রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে এই অঞ্চলকে পাহারা দেন। সেই কারণেই সন্ধ্যার পরে মন্দিরে কেউ থাকেন না, এমনকি পুরোহিতেরাও রাতে সেখানে অবস্থান করেন না বলে প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। যদিও এই দাবিগুলি স্থানীয় লোকবিশ্বাসের অংশ; এর কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
### বনদেবী ও প্রকৃতি রক্ষার বার্তা
বনদেবীর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবেশ সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও। বহু প্রজন্ম ধরে এলাকার মানুষ বিশ্বাস করে আসছেন, বন কেটে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করলে দেবী অসন্তুষ্ট হন। এই বিশ্বাসই স্থানীয়দের মধ্যে বন সংরক্ষণের একটি সামাজিক সংস্কৃতি তৈরি করেছে। ফলে এই মন্দির শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতারও প্রতীক হয়ে উঠেছে।
### ‘The Vvaan’-এর গল্পে বনদেবীর ছায়া
সিদ্ধার্থ মালহোত্র ও তমান্না ভাটিয়ার ছবি **‘The Vvaan’**-এর ট্রেলারে রহস্যময় জঙ্গল, অলৌকিক নিয়ম এবং বনদেবীর শক্তির যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা এই মন্দিরকে ঘিরে প্রচলিত লোককথার সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকেই। ছবির কাহিনিতে সিদ্ধার্থের চরিত্রটি প্রথমে দেবীর শক্তিকে অস্বীকার করলেও পরে একের পর এক অদ্ভুত ঘটনার মুখোমুখি হয়। ছবিতে ছটপুজোর মতো বিহারের সংস্কৃতিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে নির্মাতারা ছবিটি সরাসরি এই মন্দিরের জীবনীচিত্র বলে দাবি করেননি; বরং স্থানীয় লোককথা ও সাংস্কৃতিক উপাদান থেকে অনুপ্রেরণার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
### পর্যটকদের কাছেও বাড়ছে আকর্ষণ
ছবির ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই বিহটার বনদেবী মন্দির নিয়ে দেশজুড়ে আগ্রহ বেড়েছে। আগে এই স্থানটি মূলত স্থানীয় মানুষের মধ্যেই পরিচিত ছিল। এখন বহু পর্যটক ও ভ্রমণপ্রেমী এই রহস্যময় মন্দিরের ইতিহাস জানতে চাইছেন। ঘন সবুজ পরিবেশ, গ্রামীণ সংস্কৃতি এবং শতাব্দীপ্রাচীন লোককথা মিলিয়ে এই স্থানটি এখন ধর্মীয় তীর্থের পাশাপাশি একটি আকর্ষণীয় ভ্রমণগন্তব্য হিসেবেও পরিচিতি পাচ্ছে।
### লোককথা থেকে জাতীয় আলোচনায়
বিহারের বনদেবী মন্দিরের ইতিহাস প্রমাণ করে, ভারতের বহু আঞ্চলিক লোকবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এখনও সাধারণ মানুষের কাছে ততটা পরিচিত নয়। ‘The Vvaan’-এর মতো একটি বলিউড ছবি সেই অজানা ইতিহাসকে নতুন করে আলোচনায় এনে দিয়েছে। মন্দিরকে ঘিরে প্রচলিত কাহিনি সত্য হোক বা লোকবিশ্বাসের অংশ—চারশো বছরের এই বনদেবী মন্দির আজও বিহারের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে রয়েছে।
—


