উত্তরবঙ্গ সফরের মাঝেই গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সভাপতি বিমল গুরুংয়ের সঙ্গে দেখা করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার জলপাইগুড়ির চালসার টিয়াবন এলাকায় এই সাক্ষাৎ হয়। সেখানেই আগামী ৭ অক্টোবর দার্জিলিংয়ের লেবংয়ে আয়োজিত গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানান বিমল গুরুং এবং দলের সাধারণ সম্পাদক রোশন গিরি। মুখ্যমন্ত্রীও অনুষ্ঠানে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার উত্তরবঙ্গ সফরে একাধিক সরকারি কর্মসূচিতে ব্যস্ত ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। কোচবিহারে প্রশাসনিক সভা করার পর তিনি জলপাইগুড়ির নাগরাকাটায় যান। সেখানে মূর্তি নদীর উপর নবনির্মিত একটি সেতুর উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। এরপর কপ্টারে করে চালসার টিয়াবন হেলিপ্যাডে পৌঁছন তিনি। সেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা করেন বিমল গুরুং ও রোশন গিরি। ব্যস্ত কর্মসূচির মধ্যেও দুই নেতার সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়।
### ৭ অক্টোবর প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠান
গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার প্রতিষ্ঠা দিবস আগামী ৭ অক্টোবর। দার্জিলিংয়ের লেবংয়ে ওই উপলক্ষে বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। সেই অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে মোর্চা নেতৃত্ব। মঙ্গলবার চালসায় বিমল গুরুং ও রোশন গিরি মুখ্যমন্ত্রীর হাতে আমন্ত্রণপত্রও তুলে দেন। বিমলের বক্তব্য অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী আমন্ত্রণ গ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন এবং ওই দিন পাহাড়ে যাওয়ার বিষয়ে তাঁর আগ্রহ রয়েছে।
সন্ধ্যায় কলকাতার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে শুভেন্দু অধিকারীও বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান জানান। তিনি বলেন, মোর্চার প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং সেখানে থাকার তাঁর ইচ্ছা রয়েছে। যদিও অনুষ্ঠানটিতে মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি এখনও চূড়ান্ত সরকারি কর্মসূচি হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি, তাঁর প্রকাশ্য মন্তব্যে যাওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে।
### জুলাইয়েও হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
বিমল গুরুং ও শুভেন্দু অধিকারীর এই সাক্ষাৎ অবশ্য প্রথম নয়। গত জুলাইয়ের শেষের দিকে কলকাতায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছিলেন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সভাপতি বিমল গুরুং এবং সাধারণ সম্পাদক রোশন গিরি। সেই বৈঠকেই ৭ অক্টোবর মোর্চার প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীকে উপস্থিত থাকার মৌখিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। মঙ্গলবার উত্তরবঙ্গ সফরের সময় সেই আমন্ত্রণের আনুষ্ঠানিকতা আরও এক ধাপ এগোয়।
জুলাইয়ের বৈঠককে ঘিরে পাহাড়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে গুরুংয়ের নেতৃত্বাধীন মোর্চার সঙ্গে রাজ্য সরকারের যোগাযোগ আরও প্রকাশ্যে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরবঙ্গ সফরের সময় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পাহাড়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিনিধির সাক্ষাৎও এই অঞ্চলের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
### পাহাড়ের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত?
বিমল গুরুং দীর্ঘদিন ধরেই দার্জিলিং পাহাড়ের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা ২০০৭ সালে গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবিকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের রাজনীতিতে মোর্চা গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উঠে আসে। ২০১৭ সালের আন্দোলনের সময় গুরুংকে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল। পরে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অবস্থানেও পরিবর্তন আসে।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় গুরুংয়ের নেতৃত্বাধীন মোর্চা তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করেছিল। পরবর্তী সময়ে ফের বিজেপির সঙ্গে রাজনৈতিক সমন্বয় তৈরি হয়। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর উত্তরবঙ্গ ও পাহাড়ের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। গুরুংয়ের সঙ্গে রাজ্য সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সাম্প্রতিক যোগাযোগ সেই পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি অংশ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
তবে কোনও একটি সাক্ষাৎ বা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো তথ্য এখনও নেই। প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি হলে তা পাহাড়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে অবশ্যই নজর কাড়বে, কিন্তু তার রাজনৈতিক তাৎপর্য কী হবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপ এবং সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্যের উপর।
### পাহাড়ের উন্নয়ন ও রাজনৈতিক সমস্যাও আলোচনায়
গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সঙ্গে রাজ্য সরকারের যোগাযোগের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক অনুষ্ঠান নয়, পাহাড়ের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক বিষয়গুলিও গুরুত্বপূর্ণ। দার্জিলিং, কালিম্পং এবং সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকার দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে আলাদা আলাদা দাবি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রশাসনিক ক্ষমতার বণ্টন, স্থানীয় স্বশাসন, কর্মসংস্থান, পর্যটন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দাবিগুলি।
সম্প্রতি বিমল গুরুংয়ের নেতৃত্বাধীন মোর্চা GTA-র মাধ্যমে বাস্তবায়িত জল জীবন মিশনের কয়েকটি প্রকল্প নিয়েও রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোর্চা প্রায় ২৮০টি প্রকল্পের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত ও অডিটের দাবি জানিয়েছে এবং কয়েকটি এলাকায় প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এগুলি অবশ্য মোর্চার অভিযোগ; অভিযোগগুলির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
পাহাড়ের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমস্যার ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আলোচনার উদ্যোগ রয়েছে। ২০২৫ সালে কেন্দ্র পাহাড়ের রাজনৈতিক সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধানের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে একজন ইন্টারলোকিউটর নিয়োগ করেছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। পৃথক রাজ্য বা বৃহত্তর রাজনৈতিক সমাধানের প্রশ্নে পাহাড়ের বিভিন্ন দলের অবস্থানও এক নয়। ফলে এই বিষয়গুলি নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
### পুজোর আগে ফের পাহাড় সফরের সম্ভাবনা
দুর্গাপুজোর আগে মুখ্যমন্ত্রীর পাহাড় সফরের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ৭ অক্টোবরের অনুষ্ঠানটি দার্জিলিংয়ের লেবংয়ে হওয়ায় সেখানে রাজ্য সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। তবে মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আপাতত শুধু অনুষ্ঠানে থাকার ইচ্ছার কথা জানানো হয়েছে। চূড়ান্ত সফরসূচি বা সরকারি কর্মসূচি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এটিকে সম্ভাব্য সফর হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, বিমল গুরুং জানিয়েছেন যে তাঁদের আমন্ত্রণে মুখ্যমন্ত্রীর তরফে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গিয়েছে। মোর্চা নেতৃত্বও মুখ্যমন্ত্রীকে পাহাড়ে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহে ৭ অক্টোবরের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকার, মোর্চা এবং পাহাড়ের অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ে কি না, সেদিকেই নজর থাকবে।
সব মিলিয়ে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং বিমল গুরুংয়ের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎ উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ৭ অক্টোবর গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত উপস্থিত থাকেন কি না, সেটিই এখন মূল নজরে। পাশাপাশি পাহাড়ের উন্নয়ন, প্রশাসনিক কাঠামো এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দাবিগুলি নিয়ে আগামী দিনে রাজ্য সরকারের সঙ্গে মোর্চার আলোচনার পরিধি কতটা বাড়ে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।



