নিউইয়র্কে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগে নতুন করে গতি দেখা গেল। মঙ্গলবার মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। ইরানের সংবাদমাধ্যমের দাবি, এই বৈঠকে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনার পাশাপাশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। বৈঠকে তেহরানের পক্ষ থেকে হরমুজ খুলে দেওয়ার জন্য একাধিক শর্ত মার্কিন প্রতিনিধির সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে জানানো শর্তগুলির মধ্যে রয়েছে আমেরিকার নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, বিদেশে আটকে থাকা বা ‘ফ্রোজেন’ ইরানি সম্পদ মুক্ত করা এবং ইরান ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য এলাকায় সামরিক হামলা বন্ধ করা। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, আরাঘচি ও উইটকফের বৈঠকে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার বিষয়টি সরাসরি আলোচনায় আসে। তবে বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে কোনও চূড়ান্ত চুক্তি হয়েছে, এমন কোনও ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
এই বৈঠকের আগে থেকেই হরমুজ প্রণালী নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছিলেন, আমেরিকা সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানের বন্দরগুলির ওপর অবরোধ তুলে নিলে তেহরান সাত দিনের মধ্যে প্রণালীটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে প্রস্তুত। ইরানের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছিল, ওয়াশিংটনকে প্রথমে কূটনৈতিক সমাধানের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানাতে হবে এবং এরপর আলোচনার জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
হরমুজ প্রণালীর গুরুত্বের কারণেই এই আলোচনা আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান জলপথ এটি। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ এই জলপথ দিয়ে চলাচল করত এবং বিশ্বের দৈনিক অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সঙ্গে এই পথের যোগাযোগ ছিল। সাম্প্রতিক সংঘাতের ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমেছে। ২২ সেপ্টেম্বরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, তার আগের দিন মাত্র দুটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ পার হয়েছিল।
ফলে হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে কি না, তা শুধু আমেরিকা ও ইরানের সম্পর্কের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, উপসাগরীয় দেশগুলির রপ্তানি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবও বিকল্প পথে তেল সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ড্রোন হামলার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া সৌদি আরবের East-West Pipeline ফের চালু হয়েছে। ওই পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লক্ষ ব্যারেল পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল রেড সি-র দিকে পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আরাঘচি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি তেহরানের আস্থার প্রশ্নও তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যর্থতার কারণে রাষ্ট্রসংঘের প্রতি ইরানের আস্থা কমেছে বা হারিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু দেশ আন্তর্জাতিক সংস্থা, আন্তর্জাতিক আইন এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নিয়মকে নিজেদের স্বার্থে উপেক্ষা করার সুযোগ নিচ্ছে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইরান যে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চেও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে চাইছে, তা স্পষ্ট হয়েছে।
অন্যদিকে, একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে ইরান নিয়ে কঠোর বক্তব্য রাখেন। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার আহ্বান জানান এবং ভবিষ্যতে একটি চুক্তির সম্ভাবনার কথাও বলেন। রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প বলেছেন, নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর একটি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। একইসঙ্গে তাঁর বক্তব্যে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক ও রাজনৈতিক ভাষাও ছিল।
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য এবং ইরানের শর্তের মধ্যে এখনও যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে তেহরান সামরিক চাপ, অবরোধ এবং অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের অবসানকে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। ফলে নিউইয়র্কের বৈঠকটি কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হলেও, এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধবিরতি বা পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা হয়েছে—এমন কোনও তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
এরই মধ্যে কাতার-সহ কয়েকটি দেশ মধ্যস্থতার মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান তাদের প্রস্তাব মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আমেরিকার কাছে আগেই পাঠিয়েছিল এবং রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদকে কূটনীতি পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ হিসেবে দেখছে।
হরমুজ নিয়ে আলোচনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা। ফ্রান্সও রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এমন একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগের কথা বিবেচনা করছে, যার লক্ষ্য হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। কূটনীতিকদের মতে, প্রস্তাবিত উদ্যোগে জলপথের নিরাপত্তাকে বৃহত্তর ইরান-সংক্রান্ত সংঘাত থেকে আলাদা রাখার চেষ্টা করা হতে পারে।
সব মিলিয়ে নিউইয়র্কে আরাঘচি ও উইটকফের তিন ঘণ্টার বৈঠককে আমেরিকা-ইরান সংঘাতের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক যোগাযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান হরমুজ খুলতে যে শর্তগুলি সামনে রেখেছে, সেগুলি বাস্তবায়নের বিষয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান এখনও স্পষ্ট নয়। একইভাবে, হরমুজ প্রণালী কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, কিংবা দুই দেশ বৃহত্তর যুদ্ধবিরতি বা শান্তিচুক্তির দিকে এগোতে পারবে কি না, সেটিও এখনও অনিশ্চিত। তবে রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে সরাসরি যোগাযোগ এবং মধ্যস্থতাকারীদের সক্রিয়তার ফলে আলোচনার একটি নতুন পথ তৈরি হয়েছে। আগামী দিনগুলিতে সেই পথ কতটা এগোয়, তার ওপরই নির্ভর করবে হরমুজের বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ।


