ডুরান্ড কাপের হতাশা কাটিয়ে এবার আইএফএ শিল্ডে অভিযান শুরু করতে চলেছে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। ২৩ সেপ্টেম্বর শ্রীনিধি ডেকানের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়েই শুরু হচ্ছে সবুজ-মেরুনের ২০২৬ আইএফএ শিল্ড অভিযান। প্রথমে প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী ম্যাচে ইস্টবেঙ্গল ও মহমেডান এসসির মুখোমুখি হওয়ার কথা থাকলেও মহমেডান প্রতিযোগিতা থেকে নাম প্রত্যাহার করায় সূচিতে পরিবর্তন আসে। সেই কারণে বুধবার মোহনবাগান-শ্রীনিধি ডেকান ম্যাচ দিয়েই শুরু হচ্ছে এবারের শিল্ড।
এবারের আইএফএ শিল্ডে মোট ছয়টি দল অংশ নিচ্ছে। দুই গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে দলগুলিকে। মোহনবাগান রয়েছে শ্রীনিধি ডেকান এবং নর্থইস্ট ইউনাইটেডের সঙ্গে। অন্য গ্রুপে রয়েছে ইস্টবেঙ্গল, ক্যালকাটা কাস্টমস এবং পাঞ্জাব এফসি। গ্রুপ পর্বে প্রতিটি দল নিজেদের গ্রুপের অন্য দুই দলের বিরুদ্ধে খেলবে। মোহনবাগানের পরবর্তী গ্রুপ ম্যাচ ২৯ সেপ্টেম্বর নর্থইস্ট ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে।
শ্রীনিধির বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচটি তাই মোহনবাগানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে নতুন মরশুমের আগে দলের বিদেশি ফুটবলারদের ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দেওয়ার বিষয় রয়েছে, অন্যদিকে ডুরান্ড কাপের পর দলের ছন্দ ও প্রস্তুতি কতটা এগিয়েছে, সেটিও এই ম্যাচে বোঝা যেতে পারে। আইএফএ শিল্ডকে তাই শুধুমাত্র ট্রফির লড়াই হিসেবে নয়, আসন্ন ইন্ডিয়ান সুপার লিগের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। চলতি বছর আইএসএল শুরু হওয়ার কথা ১০ অক্টোবর থেকে।
মোহনবাগান গতবার আইএফএ শিল্ডের চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ফাইনালে ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়ে ট্রফি ঘরে তুলেছিল সবুজ-মেরুন শিবির। ফলে এবার শিল্ডে নামার আগে তাদের সামনে গতবারের সাফল্য ধরে রাখার প্রশ্নও রয়েছে। ডুরান্ড কাপে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার পর আইএফএ শিল্ডে দলের পারফরম্যান্সের দিকে সমর্থকদের নজর থাকবে।
দলের প্রস্তুতিতেও সেই গুরুত্ব দেখা যাচ্ছে। মোহনবাগান ইতিমধ্যেই শিল্ডের জন্য ৩৫ জন ফুটবলারকে রেজিস্ট্রেশন করিয়েছে। এই প্রতিযোগিতায় ছয়জন বিদেশি ফুটবলারকে একসঙ্গে মাঠে নামানোর সুযোগ রয়েছে। ফলে আইএসএলের আগে বিদেশি খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি এবং ম্যাচ ফিটনেস বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই প্রতিযোগিতা কাজে লাগতে পারে।
মোহনবাগানের স্কোয়াডে থাকা জেমি ম্যাকলারেন, আলবার্তো রডরিগেজ, সমীর জেলকোভিচ এবং দেজন দ্রাজিচদের মতো বিদেশি ফুটবলারদের ম্যাচে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সমীর জেলকোভিচের ক্ষেত্রে আপাতত চোটের বিষয়টি রয়েছে। তিনি দলের সঙ্গে অনুশীলন না করে রিহ্যাব করেছেন বলে সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ফলে শ্রীনিধির বিরুদ্ধে তাঁকে পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে অপেক্ষা রয়েছে।
মোহনবাগানের জন্য আরও একটি বিষয় হল স্থানীয় ফুটবলারদের ব্যবহার। কলকাতা লিগে দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায় শিল্ডের শুরুতে অফিসের ম্যাচের কারণে খেলতে নাও পারেন। ফলে কোচকে দলের প্রথম একাদশ সাজানোর ক্ষেত্রে একাধিক বিষয় মাথায় রাখতে হতে পারে।
শিল্ডের ম্যাচগুলি দুপুর ৩টেয় শুরু হওয়ায় পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য মোহনবাগান অনুশীলনের সময়ও বদলেছে। কয়েক দিন ধরে দুপুর ৩টে থেকে অনুশীলন করছে দল। ম্যাচের সময়ে গরম ও আর্দ্রতার প্রভাব সামলানো এবং একই সময়ে শারীরিকভাবে প্রস্তুত থাকার জন্য এই পরিবর্তন করা হয়েছে।
শ্রীনিধি ডেকানও ভারতীয় ফুটবলে পরিচিত একটি দল। আই-লিগের এই ক্লাব গত কয়েক মরশুমে ধারাবাহিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলেছে। ফলে ম্যাচটিকে সহজভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে গ্রুপ পর্বে প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব থাকায় প্রথম ম্যাচ থেকেই পয়েন্ট সংগ্রহ করার প্রয়োজন রয়েছে।
মোহনবাগানের গ্রুপে নর্থইস্ট ইউনাইটেডও রয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর শ্রীনিধি ডেকান ও নর্থইস্ট ইউনাইটেডের ম্যাচের পর ২৯ সেপ্টেম্বর মোহনবাগান মুখোমুখি হবে নর্থইস্টের। অর্থাৎ সবুজ-মেরুনের জন্য গ্রুপ পর্বে মাত্র দুটি ম্যাচ। ফলে প্রতিটি ম্যাচের ফল পরবর্তী পর্বের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এবারের শিল্ডের সূচিতেও বেশ কিছু পরিবর্তন হয়েছে। মহমেডান প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর পর গ্রুপ বিন্যাস ও ম্যাচের সময়সূচিতে পরিবর্তন এসেছে। প্রাথমিকভাবে মঙ্গলবার প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত বুধবার মোহনবাগান-শ্রীনিধি ম্যাচ দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু হচ্ছে। ইস্টবেঙ্গল তাদের প্রথম ম্যাচ খেলবে ২৪ সেপ্টেম্বর ক্যালকাটা কাস্টমসের বিরুদ্ধে।
ইস্টবেঙ্গল এবার ৫৩ জন ফুটবলারকে শিল্ডের জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছে। সিনিয়র দলের পাশাপাশি জুনিয়র ফুটবলারদেরও তালিকায় রাখা হয়েছে। অন্যদিকে মোহনবাগানের ৩৫ জনের রেজিস্ট্রেশন থেকে বোঝা যাচ্ছে, দলের বিভিন্ন খেলোয়াড়কে প্রতিযোগিতায় ব্যবহারের সুযোগ থাকছে। আইএসএলের আগে স্কোয়াডের বিভিন্ন সদস্যকে ম্যাচের মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে এই সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
শিল্ডের সময়সূচি অনুযায়ী, মোহনবাগানের প্রথম ম্যাচ ২৩ সেপ্টেম্বর এবং দ্বিতীয় ম্যাচ ২৯ সেপ্টেম্বর। অন্যদিকে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ শেষ হওয়ার পর নকআউট পর্ব শুরু হবে। সেমিফাইনাল ও ফাইনালের তারিখ ও ভেন্যু নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে সূচির সামান্য পার্থক্য রয়েছে এবং আয়োজকদের পরবর্তী ঘোষণার উপর নির্দিষ্ট তথ্য নির্ভর করছে।
মোহনবাগান শিবিরের জন্য এই প্রতিযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল দলের নতুন মরশুমের প্রস্তুতি। আইএসএল শুরু হওয়ার আগে হাতে খুব বেশি সময় নেই। তাই বিদেশি ও ভারতীয় ফুটবলারদের মধ্যে সমন্বয়, ম্যাচের গতি এবং কোচের কৌশল মাঠে প্রয়োগ করার সুযোগ এই টুর্নামেন্টে পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে যারা আইএসএলে নিয়মিত সুযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকবেন, তাদের কাছেও নিজেদের পারফরম্যান্স দেখানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষ করে গোলরক্ষক, ডিফেন্স, মিডফিল্ড ও আক্রমণভাগে বিভিন্ন কম্বিনেশন পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ থাকতে পারে। প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে খেলিয়ে ফুটবলারদের ফিটনেস ও ম্যাচ টেম্পো যাচাই করা যায়, যা শুধু অনুশীলন থেকে সম্ভব নয়। ফলে কোচিং স্টাফের কাছেও শ্রীনিধির বিরুদ্ধে ম্যাচটি দলের বর্তমান অবস্থান বোঝার একটি সুযোগ।
ডুরান্ড কাপের পর মোহনবাগান শিবিরে স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রতিযোগিতাকে ঘিরে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে শিল্ডে দলের সামনে একসঙ্গে দুটি লক্ষ্য রয়েছে—টুর্নামেন্টে এগিয়ে যাওয়া এবং একই সঙ্গে আইএসএলের আগে স্কোয়াডকে প্রস্তুত করা। এই দুই লক্ষ্য কীভাবে সামঞ্জস্য করা হয়, তা ম্যাচগুলিতে নজর কাড়তে পারে।
শ্রীনিধির বিরুদ্ধে ম্যাচে তাই শুধু ফল নয়, মোহনবাগানের একাদশ, বিদেশি ফুটবলারদের ব্যবহার, তরুণদের সুযোগ এবং দলের কৌশল—সবকিছুর দিকেই নজর থাকবে। বিশেষ করে সমীর জেলকোভিচের চোটের পরিস্থিতি এবং সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপস্থিতি থাকলে দলের আক্রমণভাগে কী পরিবর্তন আসে, সেটিও দেখার বিষয়।
সবুজ-মেরুন সমর্থকদের জন্য আইএফএ শিল্ডের গুরুত্ব আরও বেড়েছে গতবারের সাফল্যের কারণে। গতবারের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এবার তারা টুর্নামেন্টে নামছে। ফলে শুরুতেই শ্রীনিধি ডেকানের বিরুদ্ধে ভালো প্রস্তুতি এবং ফল পাওয়ার চেষ্টা থাকবে বলেই আশা করা হচ্ছে। তবে ফুটবলে ম্যাচের ফল মাঠেই নির্ধারিত হয়, তাই প্রতিপক্ষের শক্তি, ম্যাচের পরিস্থিতি এবং খেলোয়াড়দের দিনের পারফরম্যান্স গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, ২৩ সেপ্টেম্বরের মোহনবাগান-শ্রীনিধি ডেকান ম্যাচ দিয়েই শুরু হচ্ছে ২০২৬ আইএফএ শিল্ড। মহমেডানের সরে দাঁড়ানোর কারণে সূচিতে পরিবর্তন আসায় এই ম্যাচই এবার প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী ম্যাচে পরিণত হয়েছে। মোহনবাগান গতবারের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে মাঠে নামছে এবং সামনে রয়েছে শ্রীনিধি ডেকান ও নর্থইস্ট ইউনাইটেডকে নিয়ে গ্রুপ পর্ব। ছয় বিদেশি খেলানোর সুযোগ, ৩৫ জন ফুটবলারের রেজিস্ট্রেশন এবং আইএসএলের আগে ম্যাচ খেলার সুযোগ—সব মিলিয়ে শিল্ড মোহনবাগানের জন্য একাধিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেখার, শ্রীনিধির বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে সবুজ-মেরুন শিবির কীভাবে তাদের অভিযান শুরু করে।


