রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভার মঞ্চ থেকে ইরানকে ফের কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রসংঘের ৮১তম সাধারণ সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে ইরানকে কার্যত দু’টি পথের সামনে দাঁড় করান তিনি—চুক্তি করতে হবে, অথবা ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। ট্রাম্পের ভাষায়, তাঁর সামনে এখন বড় সিদ্ধান্ত। ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথে যাওয়া হবে, নাকি দেশটিকে ‘নরকে’ ঠেলে দেওয়া হবে—সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাঁকে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, আমেরিকার সামরিক অভিযানের কারণে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোতে পারেনি।
রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এখনও অব্যাহত। কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তপ্ত। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ট্রাম্প তাঁর ভাষণে দাবি করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে আটকানোই মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং তেহরানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ চুক্তির প্রশ্ন।
ট্রাম্পের বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তাঁর তথাকথিত ‘বড় সিদ্ধান্ত’। তিনি বলেন, আমেরিকার সামনে মূলত দুটি পথ রয়েছে। একদিকে রয়েছে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করে সংঘাতের অবসান ঘটানোর চেষ্টা। অন্যদিকে রয়েছে আরও কঠোর পদক্ষেপ, যার ফলে ইরান ভয়াবহ ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইরানকে ভবিষ্যতে পুনর্গঠন এবং উন্নতির সুযোগ দেওয়া হবে, নাকি দেশটিকে এমন পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া হবে, যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে কড়া হুঁশিয়ারির পাশাপাশি ট্রাম্প কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি। বরং তিনি আশা প্রকাশ করেন, নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে। তাঁর দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের জন্যও আলোচনায় বসা লাভজনক হবে। অর্থাৎ একদিকে সামরিক চাপ এবং অন্যদিকে আলোচনার দরজা খোলা রাখার কৌশলই আপাতত ওয়াশিংটনের অবস্থান বলে তাঁর বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ট্রাম্প আরও জানান, ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার জন্য অন্যান্য দেশকেও আমেরিকার সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তেহরানের উপর সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা গেলে ইরান আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য হতে পারে। তিনি বিশ্বের দেশগুলিকে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করার আহ্বান জানান। এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট যে, আমেরিকা শুধু সামরিক শক্তির উপর নির্ভর করতে চাইছে না; অর্থনৈতিক চাপকেও কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
ইরান-আমেরিকা সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে পারমাণবিক কর্মসূচি। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। তেহরান অবশ্য বরাবরই দাবি করে এসেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য অসামরিক প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানই দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার অন্যতম প্রধান কারণ।
বর্তমান সংঘাতের আগে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জুনে একটি সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে সংঘাত কমানো এবং পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত চুক্তির পথে এগোনোর চেষ্টা হয়েছিল। সেই সমঝোতার সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের স্বাভাবিক চলাচল এবং পারমাণবিক প্রশ্নে আলোচনার বিষয়ও যুক্ত ছিল। কিন্তু নির্ধারিত আলোচনার সময়সীমার মধ্যে চূড়ান্ত সমাধান না হওয়ায় পরিস্থিতি ফের খারাপ হয়ে যায়।
হরমুজ প্রণালীর প্রসঙ্গও ট্রাম্পের বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণ পথ হিসেবে এই জলপথের গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে সামরিক সংঘাত বা জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন নৌবাহিনী এই গুরুত্বপূর্ণ রুট দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহণে সহায়তা করেছে। ফলে ইরানকে ঘিরে সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমস্যা নয়; এর সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নও সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে নিজের প্রশাসনের সামরিক সাফল্যের কথাও উঠে আসে। তিনি দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে মার্কিন পদক্ষেপ সফল হয়েছে এবং তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে দূরে রাখা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে আমেরিকার সহযোগিতার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নীতিকে আন্তর্জাতিক মহলের সামনে যুক্তিযুক্ত হিসেবে তুলে ধরা।
তবে ট্রাম্পের এই কড়া বক্তব্য নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভা সাধারণত বিভিন্ন দেশের নেতাদের কূটনৈতিক সমাধান, শান্তি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানানোর অন্যতম প্রধান মঞ্চ। সেখানে একটি সদস্য রাষ্ট্রকে ‘ধ্বংস’ বা ‘নরকে ঠেলে দেওয়ার’ মতো ভাষায় হুঁশিয়ারি দেওয়া নিঃসন্দেহে উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে। বিশেষ করে যখন আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাত ইতিমধ্যেই বহু মাস ধরে চলছে।
অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধিরাও রাষ্ট্রসংঘের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্য সরাসরি ইরানি প্রতিনিধিদের সামনেই পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক দূরত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। যদিও একই সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ট্রাম্পের বক্তব্যে নভেম্বরের নির্বাচনের পর চুক্তির সম্ভাবনার কথা উঠে আসায় বোঝা যাচ্ছে, ওয়াশিংটন এখনও একটি রাজনৈতিক সমাধানের রাস্তা খোলা রাখতে চাইছে।
ট্রাম্পের ভাষণে শুধু ইরান নয়, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির সমালোচনাও ছিল। রাষ্ট্রসংঘের ভূমিকা, আন্তর্জাতিক আমলাতন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নিয়েও তিনি কড়া মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে আমেরিকার জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি। এর ফলে এবারের রাষ্ট্রসংঘের ভাষণেও তাঁর ‘America First’ নীতির প্রতিফলন দেখা গিয়েছে।
ইরান প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশনীতি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। ট্রাম্প একদিকে শক্তিশালী সামরিক অবস্থান দেখাচ্ছেন, অন্যদিকে নির্বাচনের পরে চুক্তির সম্ভাবনার কথা বলছেন। ফলে তাঁর নীতিতে সামরিক চাপ এবং কূটনৈতিক আলোচনার একটি দ্বৈত কৌশল দেখা যাচ্ছে।
এর আগে ১৯ সেপ্টেম্বরও ট্রাম্প জানিয়েছিলেন যে ইরান একটি চুক্তিতে আগ্রহী বলে তিনি মনে করেন এবং যুদ্ধ শেষের দিকে এগোতে পারে বলে আশা করছেন। তবে পরবর্তী কয়েক দিনে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলায়নি। ফলে রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে তাঁর নতুন হুঁশিয়ারি থেকে বোঝা যাচ্ছে, আলোচনার পাশাপাশি ওয়াশিংটন তেহরানের উপর চাপও বজায় রাখতে চাইছে।
ইরানের জন্যও পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। একদিকে রয়েছে মার্কিন সামরিক চাপ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। তেলের বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈদেশিক মুদ্রার উপর দীর্ঘদিন ধরে চাপ রয়েছে। আমেরিকা যদি আরও দেশকে ইরানের অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতায় যুক্ত করতে পারে, তাহলে তেহরানের উপর চাপ আরও বাড়তে পারে। ট্রাম্পের রাষ্ট্রসংঘের বক্তব্যে এই কৌশলই স্পষ্ট হয়েছে।
তবে ইরান আলোচনায় ফিরবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ কোনও চুক্তিতে পৌঁছতে হলে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ সামরিক পদক্ষেপ—একাধিক বিষয় নিয়ে সমঝোতা প্রয়োজন। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসও গভীর। ফলে শুধুমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই দ্রুত চুক্তি সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক মহলের কাছেও সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হল সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা। ইরানকে ঘিরে সংঘাতের সঙ্গে ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। তেল পরিবহণ, বাণিজ্যপথ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার উপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
এই কারণেই ট্রাম্পের রাষ্ট্রসংঘের ভাষণকে শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ, আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিশ্ব কূটনীতির প্রশ্ন। একদিকে ট্রাম্পের ‘চুক্তি’ করার ইচ্ছা, অন্যদিকে ‘ধ্বংস’-এর হুঁশিয়ারি—দুই বিপরীত বার্তাই তাঁর বক্তব্যে পাশাপাশি রয়েছে।
আগামী কয়েক সপ্তাহ তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত ইরান-আমেরিকা সংঘাত কোন দিকে যায়, সেটি নজরে থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের। এর মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় কি না, সামরিক অভিযান বাড়ে কি না অথবা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হয় কি না—প্রতিটি ঘটনাই পরিস্থিতির উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যে ইরানকে নিয়ে আমেরিকার কড়া অবস্থান আরও একবার স্পষ্ট হয়েছে। তিনি তেহরানকে আলোচনার পথে আসার আহ্বান জানিয়েছেন, কিন্তু একই সঙ্গে চুক্তি না হলে ভয়াবহ সামরিক পরিণতির হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। নভেম্বরের নির্বাচনের পর একটি চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে বলে তাঁর দাবি। পাশাপাশি বিশ্বের দেশগুলিকে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ফলে ট্রাম্পের বার্তায় একদিকে কূটনীতির দরজা খোলা থাকলেও অন্যদিকে সামরিক চাপের হুমকিও প্রবল। এখন প্রশ্ন, তেহরান এই বার্তার কী জবাব দেয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে গিয়ে থামে, নাকি পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ সংঘাতের দিকে এগোয়।


