গুজরাটের সুরাটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুলিশের দাবি, দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পনা করেই আগুন লাগানো হয়েছিল শ্যাম সঙ্গিনী টেক্সটাইল মার্কেটে। আর সেই আগুনের নেপথ্যে রয়েছে ওই বাজারেরই এক প্রাক্তন কর্মী। অভিযোগ, মাত্র **১০ হাজার টাকা বেতন বকেয়া** থাকাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল তাঁর। কর্মক্ষেত্রে অপমানিত হওয়ার অভিযোগও করেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সেই রাগ থেকেই ব্যবসায়ীকে ‘শিক্ষা’ দিতে দোকানে আগুন লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। ভয়াবহ সেই আগুনে চার ব্যবসায়ীর অন্তত ১৭টি দোকানের মালপত্র পুড়ে যায়। ক্ষতির পরিমাণ প্রায় **২৪ কোটি টাকা** বলে পুলিশ জানিয়েছে। ঘটনায় প্রাক্তন হিসাবরক্ষক বিনোদ সালভেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ঘটনাটি ঘটে ৯ সেপ্টেম্বর। সুরাটের সারোলি এলাকার শ্যাম সঙ্গিনী টেক্সটাইল মার্কেটের একটি অংশে গভীর রাতে আচমকা আগুন লাগে। প্রথমে এটিকে সাধারণ অগ্নিকাণ্ড বলেই মনে করা হয়েছিল। কিন্তু আগুনের ভয়াবহতা এবং একাধিক দোকানে দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ার পর তদন্ত শুরু করে পুলিশ। দমকলকর্মীদের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। রিপোর্ট অনুযায়ী, আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ১৪ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। তবে ঘটনায় কোনও প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
আগুনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মার্কেটের ষষ্ঠ তলার দোকানগুলি। সেখানে বিভিন্ন ধরনের শাড়ি, ড্রেস ম্যাটেরিয়াল এবং অন্যান্য টেক্সটাইল সামগ্রী মজুত ছিল। আগুনের তীব্রতায় বিপুল পরিমাণ কাপড় পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তদন্তের পর পুলিশ জানিয়েছে, মোট চার ব্যবসায়ীর ১৭টি দোকান এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ব্যবসায়ী হনুমান প্রসাদের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি টাকা বলে জানা গিয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ ২৪ কোটি টাকার কাছাকাছি।
প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা মনে হলেও পরে সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখার সময় পুলিশের সন্দেহ তৈরি হয়। ফুটেজে এক ব্যক্তিকে মুখ ঢেকে মার্কেটের ভিতরে ঢুকতে এবং পরে দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। তাঁর গতিবিধি সন্দেহজনক ছিল বলে তদন্তকারীরা মনে করেন। এরপর সেই ব্যক্তির পরিচয় খুঁজতে শুরু হয় তদন্ত। ধীরে ধীরে পুলিশের সন্দেহ গিয়ে পড়ে বিনোদ সালভের উপর।
বিনোদ সালভে মহারাষ্ট্রের ধুলে জেলার বাসিন্দা। তাঁর বয়স ৩৩ বছর। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে তিনি সুরাটের ওই টেক্সটাইল মার্কেটে হনুমান প্রসাদের দোকানে হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর মাসিক বেতন ছিল প্রায় ৩০ হাজার টাকা। তবে কয়েক মাস কাজ করার পর তাঁর সঙ্গে কর্তৃপক্ষের সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশের কাছে বিনোদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মূল কারণ হিসেবে সামনে এসেছে কর্মক্ষেত্রে অপমান এবং বেতন সংক্রান্ত বিরোধ। তদন্তকারীদের দাবি, দোকানের অন্য এক হিসাবরক্ষক নিয়মিত তাঁর কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। কাজের ধরন নিয়ে তাঁকে অপমান করা হত বলেও বিনোদ অভিযোগ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি চাকরি ছেড়ে দেন বা তাঁকে ছাঁটাই করা হয়। সেই সময় তাঁর বেতনের প্রায় ১০ হাজার টাকা বকেয়া ছিল বলে তাঁর দাবি। এই টাকা না পাওয়ায় তাঁর মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়তে থাকে।
চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরেও বকেয়া টাকা পাওয়ার জন্য তিনি যোগাযোগ করেছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। কিন্তু টাকা না পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। এরপরই ব্যবসায়ীকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য আগুন লাগানোর পরিকল্পনা করেন বিনোদ—এমনটাই তদন্তকারীদের দাবি। অর্থাৎ একটি ছোট অঙ্কের বেতন সংক্রান্ত বিরোধ কীভাবে ভয়াবহ প্রতিশোধের ঘটনায় পরিণত হল, তা নিয়েই এখন চর্চা চলছে।
পুলিশের দাবি, আগুন লাগানোর আগে পরিকল্পনা করেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছিলেন অভিযুক্ত। ৮ সেপ্টেম্বর একটি পেট্রল পাম্প থেকে পেট্রল কেনেন তিনি। পরে সেই পেট্রল একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে নিয়ে মার্কেটে যান বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। এরপর টেক্সটাইলের পার্সেলগুলির উপর দাহ্য তরল ছড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। আগুন লাগানোর পর মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে বেরিয়ে যান তিনি।
সিসিটিভি ফুটেজই তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে। মার্কেটের ভিতরে এবং আশপাশের এলাকার ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে পুলিশ ওই ব্যক্তির গতিবিধি অনুসরণ করে। পরে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য অন্যান্য তথ্যও সংগ্রহ করা হয়। পুলিশের দাবি, ঘটনার পর অভিযুক্ত কিছু সময়ের জন্য সুরাটের বাইরে চলে গিয়েছিলেন। বিভিন্ন জায়গায় তাঁর গতিবিধি খতিয়ে দেখে শেষ পর্যন্ত তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তকারীদের মতে, আগুন লাগানোর পর বিনোদ প্রথমে পালিয়ে যান। কিছু রিপোর্টে জানা গিয়েছে, তিনি রাজস্থান এবং অযোধ্যার দিকেও গিয়েছিলেন। পরে সুরাটে ফিরে আসার পর তাঁকে আটক করা হয়। পুলিশের হাতে থাকা সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং মানব গোয়েন্দা সূত্র মিলিয়ে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। এরপরই গ্রেপ্তার করা হয় তাঁকে।
গ্রেপ্তারের পর পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে বিনোদ নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ স্বীকার করেছেন বলে Sangbad Pratidin-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তদন্তকারীদের কাছে তাঁর বক্তব্য, অপমান এবং বকেয়া বেতনের ক্ষোভ থেকেই ব্যবসায়ীকে শিক্ষা দিতে এই ঘটনা ঘটান তিনি। তবে তাঁর এই বক্তব্যের পাশাপাশি আগুন লাগানোর সম্পূর্ণ পরিকল্পনা, ব্যবহৃত দাহ্য পদার্থ এবং ঘটনার আগে-পরে তাঁর গতিবিধি নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত চালানো হচ্ছে।
এই ঘটনায় ব্যবসায়ী মহলেও চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। সুরাট ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টেক্সটাইল বাণিজ্যকেন্দ্র। শহরের বিভিন্ন মার্কেটে বিপুল পরিমাণ কাপড় ও পোশাকের সামগ্রী মজুত থাকে। বিশেষ করে উৎসবের মরসুমের আগে দোকান ও গুদামে বিপুল স্টক রাখা হয়। ফলে কোনও মার্কেটে আগুন লাগলে ক্ষতির পরিমাণ খুব দ্রুত কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে।
শ্যাম সঙ্গিনী মার্কেটের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটিই হয়েছে। উৎসবের মরসুমের আগে বিপুল পরিমাণ টেক্সটাইল সামগ্রী সেখানে মজুত ছিল বলে জানা গিয়েছে। সেই সামগ্রী আগুনে পুড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি আরও বেড়েছে। ২৪ কোটি টাকার সামগ্রী নষ্ট হওয়া শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট চার ব্যবসায়ীর জন্য নয়, তাঁদের সঙ্গে যুক্ত সরবরাহকারী, পরিবহণকারী এবং ক্রেতাদের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ প্রথম দিকে এটি দুর্ঘটনা বলে মনে করা হয়েছিল। বাজারের মতো জায়গায় শর্ট সার্কিট, বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা অন্য কোনও কারণে আগুন লাগা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজ সামনে আসার পর তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে কি না, তা নিয়ে পুলিশের সন্দেহ ক্রমশ জোরালো হয়। পরে তদন্তে পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের তত্ত্বই সামনে আসে।
এখানে মার্কেটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দাহ্য পদার্থ নিয়ে একজন প্রাক্তন কর্মী কীভাবে রাতের সময় বাজারের ভিতরে ঢুকতে পারলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাণিজ্যিক ভবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রাক্তন কর্মীদের পরিচয় যাচাই, নিরাপত্তারক্ষীদের নজরদারি এবং সিসিটিভি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যদিও সিসিটিভি শেষ পর্যন্ত অভিযুক্তকে শনাক্ত করতে পুলিশকে সাহায্য করেছে, তবে আগুন লাগানোর আগেই সন্দেহজনক গতিবিধি ধরা পড়েনি কেন, সেটিও তদন্তের বিষয় হতে পারে।
শুধু নিরাপত্তা নয়, কর্মী ও নিয়োগকর্তার সম্পর্কের বিষয়টিও এই ঘটনার মাধ্যমে সামনে এসেছে। বেতন নিয়ে বিরোধ বা কর্মক্ষেত্রে অপমান কোনওভাবেই এমন অপরাধের যুক্তি হতে পারে না। কিন্তু কর্মীদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন ও কর্মক্ষেত্রের আচরণে স্বচ্ছতা না থাকলে অনেক সময় বিরোধ তৈরি হতে পারে। এই ঘটনা সেই বৃহত্তর সমস্যার দিকেও ইঙ্গিত করছে।
তবে পুলিশের তদন্তে এখনও আরও কিছু বিষয় পরিষ্কার হওয়া বাকি। বিনোদ একাই এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, আগুন লাগানোর জন্য তাঁকে কেউ সাহায্য করেছিল কি না এবং আগুন লাগানোর আগে মার্কেট সম্পর্কে তিনি কতটা তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। পাশাপাশি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলির সঠিক আর্থিক ক্ষতির হিসাবও খতিয়ে দেখা হবে।
তদন্তকারীরা আরও জানতে চাইছেন, অভিযুক্ত ঠিক কোন জায়গায় পেট্রল ছড়িয়েছিলেন এবং কীভাবে আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। টেক্সটাইল সামগ্রী অত্যন্ত দাহ্য হওয়ায় আগুন দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে। তবে আগুনের বিস্তারের ধরণ বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা ঘটনার আরও নির্দিষ্ট ছবি তৈরি করার চেষ্টা করছেন।
ঘটনার পরে সুরাটের ব্যবসায়ী মহলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে বড় টেক্সটাইল মার্কেটগুলিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ, সিসিটিভি এবং প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়েও সারোলি এলাকার টেক্সটাইল মার্কেটগুলিতে একাধিক অগ্নিকাণ্ডের খবর সামনে এসেছে। ফলে অগ্নি নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসনের নজরদারি আরও বাড়ানোর দাবি উঠতে পারে।
এই ঘটনার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক অবশ্যই ক্ষতির অঙ্ক এবং অভিযুক্তের কথিত উদ্দেশ্য। মাত্র ১০ হাজার টাকা বেতন বকেয়া এবং কর্মক্ষেত্রে অপমানের অভিযোগ থেকে তৈরি ক্ষোভের পরিণতিতে প্রায় ২৪ কোটি টাকার পণ্য পুড়ে যাওয়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে চাঞ্চল্যকর। তবে পুলিশি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তের সমস্ত বক্তব্য ও অভিযোগকে তদন্তের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, সুরাটের শ্যাম সঙ্গিনী টেক্সটাইল মার্কেটের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের রহস্য অনেকটাই উন্মোচিত হয়েছে বলে দাবি পুলিশের। ৯ সেপ্টেম্বরের সেই আগুনে চার ব্যবসায়ীর অন্তত ১৭টি দোকানের পণ্য পুড়ে যায় এবং ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৪ কোটি টাকা। তদন্তে উঠে আসে প্রাক্তন হিসাবরক্ষক **৩৩ বছরের বিনোদ সালভের** নাম। পুলিশের অভিযোগ, ১০ হাজার টাকা বেতন বকেয়া থাকা এবং কর্মক্ষেত্রে অপমানিত হওয়ার ক্ষোভ থেকেই তিনি পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগান। সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য তদন্তসূত্রের ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন তদন্তকারীদের লক্ষ্য হল ঘটনার সম্পূর্ণ পরিকল্পনা, আগুন লাগানোর পদ্ধতি, অভিযুক্তের গতিবিধি এবং অন্য কারও যোগ ছিল কি না, তা নিশ্চিত করা।


