ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার আগেই ভোটার তালিকায় নাম ওঠার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ফের আইনি চাপে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত এবং এফআইআর দায়েরের আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল দিল্লির নিম্ন আদালত। এবার সেই সিদ্ধান্তই বাতিল করে দিল দিল্লির দ্বারকা আদালত। ফলে সোনিয়া গান্ধীর ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি নতুন করে আইনি পর্যালোচনার আওতায় এল। বিশেষ আদালতের বিচারপতি বিশাল গোগনে আগের আদালতের নির্দেশকে ত্রুটিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে অভিযোগটি নতুন করে বিবেচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত সোনিয়া গান্ধীর ভোটার তালিকায় নাম ওঠার সময়কাল নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, সোনিয়া গান্ধী ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার আগেই তাঁর নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সোনিয়া ১৯৮৩ সালে ভারতীয় নাগরিকত্ব পান। কিন্তু অভিযোগকারীদের বক্তব্য, তার আগেই অর্থাৎ ১৯৮০ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম দেখা যায়। এই বিষয়টিকেই কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক এবং আইনি বিতর্ক চলছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করার জন্য তদন্তের দাবি জানানো হয়েছিল।
এই অভিযোগ প্রথমে রাজনৈতিক মহলে জোরালোভাবে সামনে আসে বিজেপির নেতা অমিত মালব্যের বক্তব্যের মাধ্যমে। তিনি দাবি করেছিলেন, ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার আগেই সোনিয়া গান্ধীর নাম ভোটার তালিকায় কীভাবে এল, তা তদন্ত করা প্রয়োজন। নিজের বক্তব্যের সমর্থনে তিনি ১৯৮০ সালের একটি ভোটার তালিকার ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন ছিল, যদি সোনিয়া গান্ধী ১৯৮৩ সালে ভারতীয় নাগরিকত্ব পেয়ে থাকেন, তাহলে তার তিন বছর আগে ভোটার তালিকায় তাঁর নাম কীভাবে থাকতে পারে? এই প্রশ্ন থেকেই পরবর্তীতে বিষয়টি আদালতের দরজায় পৌঁছয়।
অভিযোগের ভিত্তিতে দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউ আদালতে মামলা করেন সেন্ট্রাল দিল্লি কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি বিকাশ ত্রিপাঠী। তাঁর আইনজীবী পবন নারাং আদালতে সোনিয়া গান্ধীর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের এবং তদন্তের আবেদন জানান। অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল ভোটার তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্তির বৈধতা। আবেদনকারীর বক্তব্য ছিল, ভোটার তালিকায় নাম ওঠার সময় যদি নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘিত হয়ে থাকে, তাহলে তার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাউস অ্যাভিনিউ আদালত ওই তদন্তের আবেদন খারিজ করে দেয়। আদালতের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকার বিষয়টি সামনে আসে। অর্থাৎ, সেই পর্যায়ে আদালত পুলিশি তদন্ত বা এফআইআর দায়েরের প্রয়োজনীয়তা দেখেনি। এর পরেই আবেদনকারী ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতের দ্বারস্থ হন। তাঁর বক্তব্য ছিল, বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা না করেই তদন্তের আবেদন খারিজ করা হয়েছে।
এবার সেই আপত্তিই গুরুত্ব পেল দ্বারকা আদালতে। বিশেষ বিচারক বিশাল গোগনে আগের নির্দেশটি খতিয়ে দেখে জানান, নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তে আইনি এবং প্রক্রিয়াগত ত্রুটি রয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তদন্তের আবেদন খারিজ করার আগে অভিযোগের বিষয়টি যথেষ্টভাবে পরীক্ষা করা হয়নি। এমনকি পুলিশের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় রিপোর্ট চাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির বক্তব্য যথাযথভাবে বিবেচনা করার বিষয়েও ঘাটতি ছিল বলে আদালত মনে করেছে।
এই কারণেই আগের নির্দেশ বাতিল করে মামলাটি ফের সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ, এখন অভিযোগটি নতুন করে শুনতে হবে। তদন্ত করা হবে কি না এবং এফআইআর দায়েরের আবেদন গ্রহণযোগ্য কি না, তা ফের বিচার করা হবে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে।
তবে আদালতের এই সিদ্ধান্তকে সোনিয়া গান্ধীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার রায় হিসেবে দেখা যাবে না। আদালত শুধুমাত্র আগের সিদ্ধান্তে ত্রুটি রয়েছে বলে সেটি বাতিল করেছে এবং অভিযোগটি নতুন করে বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হলে তবেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি স্পষ্ট হবে। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ওঠা অভিযোগ এখনও বিচারাধীন পর্যায়ে রয়েছে।
ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। একজন নাগরিকের ভোটাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁর নাম বৈধভাবে নির্বাচনী তালিকায় থাকা প্রয়োজন। তাই কারও নাম নিয়মবহির্ভূতভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠলে তা যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে কোনও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে এমন অভিযোগ সামনে এলে বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই আরও বেশি রাজনৈতিক এবং জনসমক্ষে আলোচিত হয়ে ওঠে।
সোনিয়া গান্ধীর ক্ষেত্রে বিতর্কের মূল বিষয় হল সময়ের হিসাব। অভিযোগকারীদের দাবি অনুযায়ী, ১৯৮০ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম থাকার প্রমাণ রয়েছে। অন্যদিকে সোনিয়া গান্ধী ১৯৮৩ সালে ভারতীয় নাগরিকত্ব লাভ করেন। এই দুই তথ্যের মধ্যে যে সময়ের ব্যবধান রয়েছে, সেটিই অভিযোগের প্রধান ভিত্তি। এখন আদালত এবং তদন্তকারী সংস্থার সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—১৯৮০ সালের সেই ভোটার তালিকা কতটা নির্ভরযোগ্য, সেটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল এবং সেখানে নাম অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া কী ছিল।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে, যদি সত্যিই নাগরিকত্ব পাওয়ার আগে ভোটার তালিকায় নাম ওঠে, তাহলে সেটি কীভাবে সম্ভব হয়েছিল। সেই সময়ের নির্বাচনী নথি, সংশ্লিষ্ট ভোটার তালিকার রেকর্ড এবং নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদনপত্র—সবই তদন্তের অংশ হতে পারে। একই সঙ্গে ওই সময় নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে এগুলির কোনওটিই এখনই নিশ্চিত তথ্য নয়; তদন্তের পরেই প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হবে।
মামলাটির রাজনৈতিক গুরুত্বও যথেষ্ট। সোনিয়া গান্ধী দীর্ঘদিন ধরে ভারতের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত। ফলে তাঁর নাগরিকত্ব, ভোটার তালিকায় নাম এবং নির্বাচনী অধিকার সংক্রান্ত কোনও অভিযোগ সামনে এলেই তা রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। বিরোধীরা এই ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরতে পারে, আবার কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও অভিযোগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর আগে দেশের নির্বাচনী তালিকা নিয়ে নানা সময়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে। বিশেষ করে ভোটার তালিকা সংশোধন, নাম বাদ পড়া, নতুন নাম অন্তর্ভুক্তি এবং ভোটার পরিচয় যাচাই নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সোনিয়া গান্ধীর নাম অন্তর্ভুক্তির পুরনো অভিযোগ নতুন করে আদালতে ফিরে আসায় বিষয়টি আরও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
দ্বারকা আদালতের সিদ্ধান্তের পর এখন মূল নজর ২৯ সেপ্টেম্বরের শুনানির দিকে। সেই শুনানিতে অভিযোগকারী পক্ষ কী তথ্য ও নথি আদালতের সামনে পেশ করে এবং আদালত তদন্তের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলে ভোটার তালিকায় নাম ওঠার সময়কার নথি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ড খতিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হবে। আর তদন্তের আবেদন আবারও খারিজ হলে পরবর্তী আইনি পথ কী হবে, সেটিও তখন স্পষ্ট হবে।
সব মিলিয়ে, সোনিয়া গান্ধীর ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বহু পুরনো বিতর্ক ফের আদালতের দরজায় ফিরে এসেছে। ২০২৫ সালে যে তদন্তের আবেদন খারিজ হয়েছিল, সেই সিদ্ধান্তই এবার বাতিল করেছে দিল্লির আদালত। ফলে অভিযোগটি নতুন করে বিচারাধীন হল। তবে এই মুহূর্তে কোনও অনিয়ম বা জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। আদালতের নির্দেশের মূল বিষয় হল—আগের সিদ্ধান্তটি যথেষ্ট আইনি ও প্রক্রিয়াগত পরীক্ষার ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি, তাই বিষয়টি ফের বিবেচনা করতে হবে। আগামী শুনানি এবং পরবর্তী তদন্তেই স্পষ্ট হবে, বহু বছর আগের সেই ভোটার তালিকায় সোনিয়া গান্ধীর নাম ওঠার প্রকৃত কারণ কী ছিল।


