উত্তাল তিস্তার স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল ছোট্ট হস্তীশাবক। প্রবল জলস্রোতের সঙ্গে লড়াই করে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করছিল সে। সেই সময়ই চোখে পড়ে কয়েকজন মৎস্যজীবীর। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা নৌকা নিয়ে ছুটে যান শাবকটির দিকে। প্রায় চার কিলোমিটার নদীপথ অনুসরণ করে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করা হয় তাকে। পরে বন দপ্তরের তৎপরতায় সেই শাবককে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। উত্তরবঙ্গের তিস্তায় এই হৃদয়স্পর্শী উদ্ধার অভিযানে ফের মানবিকতার নজির তৈরি করলেন স্থানীয় মৎস্যজীবীরা।
জানা গিয়েছে, ঘটনাটি ঘটেছে জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজার মহকুমার কাছে। শুক্রবার সকালে একটি হাতির দল তিস্তা নদী পার হওয়ার চেষ্টা করছিল। সেই সময় গজলডোবা ব্যারেজের কাছে দলটি নদীর স্রোতের মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছিল। হাতির দলের সঙ্গে থাকা মাত্র কয়েক দিনের ওই শাবক কোনওভাবে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর প্রবল স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অনেকটা দূরে। বন দপ্তরের তরফে জানানো হয়েছে, শাবকটির বয়স আনুমানিক তিন থেকে চার দিন বলে প্রথমে মনে করা হয়েছিল। অন্য একটি প্রতিবেদনে তার বয়স প্রায় দুই সপ্তাহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সে যে অত্যন্ত অল্পবয়সি এবং সদ্যোজাতের কাছাকাছি, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই।
তিস্তায় বর্ষার জল ও প্রবল স্রোতের কারণে পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল। নদীর জলস্তর এবং স্রোতের গতি দুটিই ছিল যথেষ্ট বেশি। সেই পরিস্থিতিতে একটি ছোট নৌকায় থাকা মৎস্যজীবীরা জলের মধ্যে একটি অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখতে পান। প্রথমে তাঁরা বুঝতে পারেননি সেটি কী। পরে কাছে যেতেই দেখা যায়, একটি ছোট হাতির শাবক জলের সঙ্গে ভেসে চলেছে। কোনওভাবে শুধু শুঁড়টি জলের উপরে রাখার চেষ্টা করছে সে। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারেন মৎস্যজীবীরা।
এরপর শুরু হয় ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযান। মৎস্যজীবীরা নিজেদের নৌকা ঘুরিয়ে শাবকটির দিকে এগিয়ে যান। প্রবল স্রোতের কারণে নৌকা নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবু তাঁরা পিছু হটেননি। প্রায় চার কিলোমিটার পর্যন্ত শাবকটির গতিপথ অনুসরণ করার পর অবশেষে তার কাছে পৌঁছন তাঁরা। কয়েকজন মৎস্যজীবী জলে নেমে শাবকটিকে নৌকার দিকে টেনে আনেন। পরে সেটিকে নৌকায় তুলে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসা হয়। পুরো উদ্ধার অভিযানে তাঁদের সাহস এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াই শাবকটির প্রাণ বাঁচানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শাবকটিকে উদ্ধার করার পর সরাসরি বন দপ্তরের কর্মীদের হাতে তুলে দেন মৎস্যজীবীরা। এরপর বন দপ্তরের কর্মীরা তার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন। শাবকটিকে কাঠামবাড়ি রেঞ্জ অফিসে নিয়ে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ভেটেরিনারি পরিষেবা দেওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে। তার শরীরে বড় কোনও আঘাত রয়েছে কি না, দীর্ঘক্ষণ জলে থাকার কারণে শারীরিক সমস্যা তৈরি হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হয়।
কিন্তু শাবকটিকে উদ্ধার করাই ছিল পুরো অভিযানের শেষ ধাপ নয়। তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই ছিল বন দপ্তরের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ সদ্যোজাত হাতির ক্ষেত্রে মায়ের সঙ্গে পুনর্মিলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন দপ্তরের কর্মীরা হাতির দলের গতিবিধি সম্পর্কে খোঁজখবর শুরু করেন। কোথায় হাতির দল রয়েছে, মা হাতিটি শাবকটির খোঁজ করছে কি না এবং কীভাবে নিরাপদে দুজনকে কাছাকাছি আনা যায়—এসব বিষয় নজরে রাখা হয়।
এর মধ্যেই আশার খবর আসে। কাছাকাছি এলাকা থেকে মা হাতির ডাক শোনা যায়। বন দপ্তরের কর্মীরা বুঝতে পারেন, মা হাতিটি তার সন্তানকে খুঁজছে। এরপর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে শাবকটিকে এমন একটি জায়গায় রাখা হয়, যেখান থেকে মা হাতিটি তাকে দেখতে এবং কাছে আসতে পারে। বনকর্মীদের বিশেষ নজর ছিল যাতে মানুষের অতিরিক্ত উপস্থিতি মা ও শাবকের পুনর্মিলনে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। কারণ বন্যপ্রাণীর ক্ষেত্রে মানুষের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ অনেক সময় স্বাভাবিক আচরণে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান হয়। মা হাতিটি ধীরে ধীরে শাবকটির কাছে চলে আসে। দীর্ঘ সময় পর নিজের সন্তানকে কাছে পেয়ে তাকে গ্রহণ করে মা। শাবকটিকে নিয়ে সে নদীর জলে যায়, তাকে স্নান করায় এবং পরে ফের জঙ্গলের দিকে চলে যায়। বন দপ্তরের কর্মীদের উপস্থিতিতে মা ও সন্তানের এই পুনর্মিলনের দৃশ্য প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছেও অত্যন্ত আবেগঘন হয়ে ওঠে।
এই ঘটনায় স্থানীয় মৎস্যজীবীদের ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। সাধারণত বন্যপ্রাণী উদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত বনকর্মী বা বিশেষজ্ঞ দলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই ঘটনায় প্রথম মুহূর্তে নদীতে থাকা মৎস্যজীবীরাই পরিস্থিতি বুঝে এগিয়ে আসেন। প্রবল স্রোতের মধ্যে নিজেদের নিরাপত্তার কথা না ভেবে তাঁরা শাবকটিকে উদ্ধার করেন। তাঁদের দ্রুত পদক্ষেপ না থাকলে এত ছোট একটি হাতির পক্ষে তিস্তায় বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ত।
বন দপ্তরের তরফেও পুরো পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হয়। হাতির দল কেন নদী পার হওয়ার চেষ্টা করছিল, তা স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতির দল বিভিন্ন কারণে নদী পার হতে পারে—খাদ্যের সন্ধান, জল পাওয়ার প্রয়োজন, বাসস্থান পরিবর্তন অথবা দলের স্বাভাবিক চলাচলের অংশ হিসেবেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এই নির্দিষ্ট ঘটনায় নদী পার হওয়ার সঠিক কারণ এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি বলে বন দপ্তরের আধিকারিকরা জানিয়েছেন।
তিস্তা নদীর মতো প্রবল স্রোতসম্পন্ন নদী উত্তরবঙ্গের হাতিদের জন্য একদিকে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা, অন্যদিকে তাদের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্ষাকালে নদীর জলস্তর বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সদ্যোজাত শাবকরা স্রোতের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় সহজেই দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। এই ঘটনায় ঠিক সেটিই ঘটেছিল বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে।
এই উদ্ধারকাণ্ডের ভিডিও ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, উত্তাল নদীর জলে ছোট্ট শাবকটি ভেসে চলেছে এবং মৎস্যজীবীরা নৌকা নিয়ে তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। পরে শাবকটিকে নৌকায় তুলে নেওয়া হয়। ভিডিওটি সামনে আসার পর মৎস্যজীবীদের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন বহু মানুষ। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীরাও তাঁদের এই উদ্যোগকে মানবিকতার উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
সবশেষে সবচেয়ে স্বস্তির খবর, শাবকটির জীবন যেমন রক্ষা পেয়েছে, তেমনই তাকে তার মায়ের কাছেও ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। একটি সদ্যোজাত হাতির জন্য মায়ের সান্নিধ্যে ফিরে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন দপ্তরের সতর্ক পরিকল্পনা এবং স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সাহসিকতার ফলে সেই অসম্ভব বলে মনে হওয়া কাজটিই সম্ভব হয়েছে। তিস্তায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে মায়ের কাছে ফেরার এই ঘটনা তাই শুধু একটি বন্যপ্রাণী উদ্ধারের খবর নয়, বরং মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানের এক আবেগঘন নজির হয়ে রইল।


