অশোকনগরের বাইগাছি এলাকায় তেল উত্তোলন প্রকল্প ঘিরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কোনও জায়গা নেই—স্পষ্ট বার্তা দিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। রবিবার অশোকনগরের ওএনজিসির তেল উত্তোলন প্রকল্প পরিদর্শনে গিয়ে আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সেখানেই প্রকল্পের কাজ ও পরিচালনাগত বিষয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না করার কথা জানান শমীক। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিজেপির কোনও কর্মী, সাংসদ বা বিধায়ক প্রকল্পের দৈনন্দিন কাজ বা পরিচালনার বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবেন না। প্রাকৃতিক সম্পদকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি না করার কথাও বলেন তিনি।
শমীক ভট্টাচার্যের এই সফর এমন সময়ে হল, যখন অশোকনগরের বাইগাছি তৈলক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই বাণিজ্যিকভাবে অপরিশোধিত তেল উৎপাদন শুরু হয়েছে। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ আগস্ট থেকে সেখানে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছে। প্রথম দিনই প্রায় ১২০০ লিটার অপরিশোধিত তেলের একটি চালান ট্যাঙ্কারে করে হলদিয়া পাঠানো হয়। এর আগে অশোকনগর প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশাসনিক ও পরিকাঠামোগত বিষয় সামনে এসেছিল। বর্তমানে প্রকল্পের উৎপাদন বাড়ানো এবং পরবর্তী পর্যায়ের কাজ এগিয়ে নেওয়াই মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন শমীক।
প্রকল্প পরিদর্শনের সময় আধিকারিকদের উদ্দেশে শমীক বলেন, তাঁদের কাজ বা পরিচালনাগত সিদ্ধান্তে কোনও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা হবে না। একই সঙ্গে বিজেপির নেতা-কর্মীদেরও প্রকল্পের কাজে নাক না গলানোর বার্তা দেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, অশোকনগরের তেলক্ষেত্রকে রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে একটি প্রাকৃতিক সম্পদ ও শিল্প প্রকল্প হিসেবে দেখা প্রয়োজন। উৎপাদন এবং পরিকাঠামোগত কাজ যাতে দ্রুত এগোয়, সেই লক্ষ্যেই সহযোগিতা করার কথা জানান তিনি।
তবে একই সঙ্গে প্রকল্পের অতীত নিয়ে রাজনৈতিক অভিযোগও তোলেন শমীক। পেট্রোলিয়াম মাইনিং লিজ বা PML পাওয়ার ক্ষেত্রে আগের রাজ্য সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী তাঁকে জানিয়েছিলেন যে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে এ বিষয়ে ১৯টি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা মেলেনি বলে তাঁর দাবি। এই বক্তব্য অবশ্য শমীকের রাজনৈতিক দাবি হিসেবে সামনে এসেছে।
অশোকনগর প্রকল্পের সঙ্গে শমীক ভট্টাচার্যের যোগাযোগ নতুন নয়। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি যখন অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেডের স্বাধীন পরিচালক ছিলেন, তখন থেকেই এই প্রকল্পের আধিকারিকদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়। প্রকল্পে অয়েল ইন্ডিয়ার ২৫ শতাংশ অংশীদারি রয়েছে। সেই সময় বোর্ডের বৈঠকেও তিনি বিষয়টি তুলেছিলেন বলে জানান শমীক। পরবর্তীতে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীকেও চিঠি দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। রাজ্যসভার সাংসদ থাকার সময়ও বিভিন্ন অধিবেশনে অশোকনগর তৈলক্ষেত্রের প্রসঙ্গ তুলেছেন বলে জানান বিজেপির রাজ্য সভাপতি।
বর্তমানে প্রকল্পের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ায় অশোকনগর তৈলক্ষেত্রকে ঘিরে আগ্রহ আরও বেড়েছে। ২০২৬ সালের অগস্টে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর খবর অন্য সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, প্রথম পর্যায়ে ট্যাঙ্কারে করে অপরিশোধিত তেল হলদিয়া রিফাইনারির দিকে পাঠানো হয় এবং প্রকল্পটি দৈনিক প্রায় ২০ ঘনমিটার অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করছিল।
অশোকনগর তৈলক্ষেত্রের ইতিহাসও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ওএনজিসি ২০১৮ সালে এই এলাকায় তেল ও গ্যাসের সন্ধান পায়। কলকাতা থেকে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ক্ষেত্রকে পূর্ব ভারতের প্রথম তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেলের মজুত থাকার কথা জানানো হয়েছে।
প্রকল্পে মোট পাঁচটি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে বলে শমীক জানিয়েছেন। এর মধ্যে একটি কূপের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। আরেকটি কূপে তুলনামূলকভাবে কম সালফারযুক্ত উচ্চমানের অপরিশোধিত তেল পাওয়া যাচ্ছে বলে তাঁর দাবি। প্রকল্পে কেন্দ্রের প্রায় ১১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে বলেও তিনি জানান। উৎপাদন আরও বাড়লে শুধু অশোকনগর নয়, গোটা উত্তর ২৪ পরগনা জেলার কর্মসংস্থান ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।
অশোকনগরকে ঘিরে শুধু অপরিশোধিত তেল উৎপাদন নয়, পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য এলাকাতেও তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন শমীক। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রানাঘাট এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বঙ্গোপসাগরের বেঙ্গল অফশোর এলাকায় তেল অনুসন্ধানের কাজ নিয়েও সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সমস্ত প্রকল্পের ক্ষেত্রে অনুসন্ধান, অনুমোদন, পরিবেশগত বিষয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
অশোকনগর তৈলক্ষেত্রের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়াকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত করেছেন শমীক। তাঁর বক্তব্য, দেশীয় উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল উৎপাদন বাড়লে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় তার ভূমিকা থাকতে পারে। একইসঙ্গে স্থানীয় স্তরে শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এই প্রকল্প দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার কতটা পূরণ করতে পারবে, তা উৎপাদনের পরিমাণ ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের উপর নির্ভর করবে।
প্রকল্পকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি এখন বাস্তব চ্যালেঞ্জ হল উৎপাদন ধারাবাহিক রাখা এবং পরিকল্পিত পরবর্তী কূপগুলির কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। শমীকের রবিবারের বার্তার মূল বিষয়ও ছিল সেই দিকেই—রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকদের কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে, অশোকনগর তৈলক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার পর এবার উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো, নতুন কূপের কাজ এগিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন করাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতির প্রকাশ্য বার্তার পাশাপাশি প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ বাস্তবে কতটা গতি পায়, সেদিকেও নজর থাকবে। অশোকনগরের তেল উৎপাদন আগামী দিনে স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং পশ্চিমবঙ্গের জ্বালানি পরিকাঠামোয় কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


