দলীয় নাম ও নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিরোধের মধ্যেই বড় বার্তা দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে দলের প্রতীক ব্যবহারের অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত তিনি প্রচারে নামবেন না বলে জানিয়েছেন। ফলে আসন্ন উপনির্বাচনকে ঘিরে তৃণমূলের প্রচারকৌশল এবং সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় নাম ও ঐতিহ্যবাহী ‘জোড়াফুল’ প্রতীক নিয়ে বর্তমানে দুই শিবিরের মধ্যে বিরোধ চলছে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী, অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির—দুই পক্ষই নিজেদের দলটির বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করছে। এই পরিস্থিতিতে প্রতীক ব্যবহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের হাতে রয়েছে।
## প্রতীক নিয়ে কমিশনে দুই পক্ষের দাবি
তৃণমূলের দলীয় নাম এবং নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে বিরোধ ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক শুনানির পর্যায়ে পৌঁছেছে। দুই পক্ষই নিজেদের দাবির পক্ষে নথি জমা দিয়েছে। কমিশন উভয় শিবিরের বক্তব্য শুনেছে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র পর্যালোচনা করছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের দাবি, তাঁর নেতৃত্বাধীন দলই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস। অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীও দলের নাম ও প্রতীকের উপর নিজেদের অধিকার দাবি করছে। এই বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারে প্রতীক ব্যবহারের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে রয়েছে।
প্রতীক সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত শুধু প্রচারের ক্ষেত্রে নয়, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া, ব্যালট বা ইভিএমে দলের পরিচিতি এবং ভোটারদের কাছে প্রার্থীর পরিচয়—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। তাই নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের দিকে নজর রাখছে দুই শিবিরই।
## উপনির্বাচনের আগে বাড়ছে চাপ
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে আগামী ৬ অক্টোবর উপনির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এই দুই কেন্দ্রকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবির নন্দীগ্রামে সঞ্চিতা প্রধান এবং রেজিনগরে রাবিউল আলম চৌধুরীকে প্রার্থী করেছে।
কিন্তু দলীয় প্রতীক নিয়ে বিরোধের কারণে প্রার্থীদের প্রচার এবং সাংগঠনিক প্রস্তুতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রতীক নিয়ে কমিশনের অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রচারে যাবেন না বলে যে বার্তা দিয়েছেন, তা এই পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, প্রতীক নিয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। কারণ একই নাম বা প্রতীক দাবি করে দুই পক্ষ মাঠে থাকলে সাধারণ ভোটারদের কাছে প্রার্থী ও দলের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে কমিশনের সিদ্ধান্তের পরই এই পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে।
## মনোনয়ন পর্বেও প্রতীক বিতর্ক
উপনির্বাচনের মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়সীমা ১৬ সেপ্টেম্বর শেষ হচ্ছে। এই সময়সীমার আগেই দলীয় প্রতীক নিয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়ায় দুই পক্ষের উপর চাপ বেড়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেজিনগরে মমতা শিবিরের প্রার্থী রাবিউল আলম চৌধুরী ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ব্যবহার করে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।
অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরও নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ফলে একই দলের নাম ও প্রতীক ব্যবহারের দাবিকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশন কোন পক্ষকে বৈধ দলীয় প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
কমিশনের তরফে উভয় পক্ষকে বক্তব্য পেশ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরকে অতিরিক্ত নথি বা চূড়ান্ত বক্তব্য জমা দেওয়ার সময়সীমাও দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
## মমতার অবস্থান কী?
এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের মূল বিষয় হল, দলীয় প্রতীক ব্যবহারের অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত তিনি নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেবেন না। তাঁর অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, প্রতীক সংক্রান্ত বিষয়টি তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।
দলীয় প্রতীক রাজনৈতিক সংগঠনের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। বহু বছর ধরে ‘জোড়াফুল’ প্রতীক তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে পরিচিত। ভোটারদের কাছে এই প্রতীক দলের সাংগঠনিক পরিচিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই প্রতীক নিয়ে আইনি ও সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রচারে যাওয়ার বিষয়ে মমতা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
তবে তিনি কবে প্রচারে নামবেন, কমিশনের সিদ্ধান্তের পর দলের প্রচারসূচি কী হবে এবং নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে প্রচারের দায়িত্ব কারা নেবেন—এসব বিষয়ে এখনও বিস্তারিত কর্মসূচি প্রকাশিত হয়নি।
## নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের দিকে নজর
দলীয় নাম ও প্রতীক সংক্রান্ত বিরোধে নির্বাচন কমিশন সাধারণত সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামো, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমর্থন, দলীয় সংবিধান এবং অন্যান্য নথি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। এই মামলাতেও দুই পক্ষের জমা দেওয়া নথি ও দাবির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
প্রতীক নিয়ে কমিশনের অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্ত ১৭ সেপ্টেম্বরের আশপাশে আসতে পারে বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সময় এবং তার প্রকৃতি কমিশনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার উপর নির্ভর করবে।
কমিশনের সিদ্ধান্তের আগে কোনও পক্ষই নিশ্চিতভাবে প্রতীক ব্যবহারের অধিকার পেয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাচ্ছে না। ফলে মনোনয়ন, প্রচার এবং নির্বাচনী প্রচারসামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের কমিশনের নির্দেশিকা মেনে চলতে হবে।
## দুই শিবিরের রাজনৈতিক লড়াই
তৃণমূলের প্রতীক নিয়ে বিরোধ শুধু সাংগঠনিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ নেই। এর রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির দলীয় ঐতিহ্য এবং প্রতিষ্ঠিত পরিচয়ের উপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে ঋতব্রত শিবির দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে দুই পক্ষের বক্তব্য এবং দাবিকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। প্রতীক সংক্রান্ত বিরোধের আইনি নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। তাই কে দলের বৈধ প্রতিনিধি, তা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের পরই স্পষ্ট হবে।
এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের পাশাপাশি বিরোধী দলগুলিও নজর রাখছে। কারণ নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনে দলীয় প্রতীক, প্রার্থীর পরিচয় এবং প্রচারের সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
## প্রচার শুরু হতে পারে সিদ্ধান্তের পর
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের পর এখন মূল নজর নির্বাচন কমিশনের দিকে। কমিশন যদি মমতা শিবিরকে দলীয় নাম ও প্রতীক ব্যবহারের অনুমোদন দেয়, তাহলে তাঁর নেতৃত্বে প্রচার দ্রুত শুরু হতে পারে। অন্য কোনও সিদ্ধান্ত হলে দলের নির্বাচনী কৌশলে পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রচার শুরু করার আগে প্রতীক নিয়ে স্পষ্টতা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। কারণ ভোটারদের কাছে দলীয় পরিচয় পরিষ্কার না হলে নির্বাচনী প্রচারে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র, প্রচারসামগ্রী এবং ভোটকেন্দ্রে দলের পরিচিতি নিয়েও প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় নাম ও ‘জোড়াফুল’ প্রতীক নিয়ে বিরোধ এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতীক ব্যবহারের অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত প্রচারে না নামার অবস্থান জানিয়েছেন। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই এখন পরবর্তী রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে। তবে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এই বিরোধ এবং তার প্রভাব নিয়ে জল্পনা অব্যাহত থাকবে।


