শিল্প ও পর্যটনের প্রসারে পশ্চিমবঙ্গে আরও চারটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চলতি মাসেই কেন্দ্র, রাজ্য সরকার এবং এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার মধ্যে ত্রিপাক্ষিক সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হবে। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর নবান্ন সভাঘরে এই চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। নবান্ন সূত্রে খবর, পুরুলিয়া, দক্ষিণ দিনাজপুর, আলিপুরদুয়ার এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে প্রস্তাবিত বিমানবন্দরগুলিকে কেন্দ্র করেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
## কোন চার জায়গায় তৈরি হবে বিমানবন্দর?
প্রস্তাবিত চারটি আঞ্চলিক বিমানবন্দরের মধ্যে রয়েছে—
* পুরুলিয়ার ছররা
* দক্ষিণ দিনাজপুরের গালুরঘাট
* আলিপুরদুয়ারের হাসিমারা সিভিল এনক্লেভ
* পশ্চিম মেদিনীপুরের কালাইরভা
এই চারটি বিমানবন্দর চালু হলে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ আরও সহজ হতে পারে। বর্তমানে কলকাতা, বাগডোগরা, দুর্গাপুর এবং কোচবিহারের মতো কয়েকটি বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বিমান পরিষেবা পরিচালিত হয়। নতুন আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলি চালু হলে দক্ষিণবঙ্গ, জঙ্গলমহল, উত্তরবঙ্গ এবং ডুয়ার্স অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল, পর্যটনকেন্দ্র এবং সীমান্তবর্তী এলাকার সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ তৈরির ক্ষেত্রে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। তবে বিমানবন্দরগুলি কবে থেকে সম্পূর্ণভাবে চালু হবে, তা নির্ভর করবে জমি, পরিকাঠামো, নিরাপত্তা এবং বিমান চলাচলের অনুমোদনের উপর।
## ২৩ সেপ্টেম্বর নবান্নে চুক্তি স্বাক্ষর
নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর নবান্ন সভাঘরে ত্রিপাক্ষিক সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হবে। কেন্দ্রীয় সরকার, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার প্রতিনিধিরা এই চুক্তিতে অংশ নেবেন।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী-সহ রাজ্য সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিক উপস্থিত থাকতে পারেন। কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের মন্ত্রী ও সচিব, এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান, মুখ্যসচিব, পরিবহণমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সাংসদ ও বিধায়কদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
চুক্তির মাধ্যমে বিমানবন্দরগুলির নির্মাণ, জমি সংক্রান্ত বিষয়, বিদ্যুৎ, জল, রাস্তা এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করাই এই চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য।
## কার কী দায়িত্ব থাকবে?
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিমানবন্দর তৈরির ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করা হয়েছে।
**রাজ্য সরকারের দায়িত্ব:**
* প্রয়োজনীয় জমির ব্যবস্থা করা
* বিমানবন্দরের সঙ্গে সংযোগকারী রাস্তা তৈরি বা উন্নত করা
* বিদ্যুৎ ও জল সরবরাহের ব্যবস্থা করা
* প্রাথমিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য স্থানীয় সহযোগিতা প্রদান
**কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব:**
* বিমানবন্দরের মূল পরিকাঠামো নির্মাণ
* প্রয়োজনীয় বিমানবন্দর সংক্রান্ত উন্নয়নমূলক কাজ
* কেন্দ্রীয় প্রকল্পের আওতায় পরিকাঠামো গড়ে তোলা
**এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার দায়িত্ব:**
* বিমান চলাচল সংক্রান্ত বিষয় দেখা
* বিমান পরিষেবা পরিচালনার পরিকল্পনা করা
* বিমানবন্দরের অপারেশনাল দিকগুলি সমন্বয় করা
এই দায়িত্ব বণ্টনের ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে প্রতিটি বিমানবন্দরের বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজের গতি আলাদা হতে পারে।
## ছররা বিমানবন্দরের ইতিহাস
পুরুলিয়ার ছররা বিমানবন্দরকে ঘিরে ইতিমধ্যেই কাজ অনেকটা এগিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে সামরিক প্রয়োজনে এই বিমানক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এটি সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বিমানক্ষেত্রটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল।
বাম আমল থেকেই ছররা বিমানবন্দর পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু নানা কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তী সময়ে কিছু কাজ শুরু হলেও তা সম্পূর্ণ হয়নি। এবার নতুন ত্রিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে ছররা বিমানবন্দরের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
ছররা বিমানবন্দর চালু হলে পুরুলিয়া এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। রঘুনাথপুর শিল্পাঞ্চল, ঝাড়খণ্ড সীমান্তবর্তী শিল্পতালুক এবং পুরুলিয়ার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ তৈরি হবে। অযোধ্যা পাহাড়, বাঘমুন্ডি এবং আশপাশের পর্যটন এলাকাগুলিতে পর্যটকদের যাতায়াতও সহজ হতে পারে।
## বালুরঘাটে ছোট বিমান চালুর পরিকল্পনা
দক্ষিণ দিনাজপুরের গালুরঘাটেও বিমানবন্দর তৈরির কাজ এগিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ১৯ আসনের ছোট বিমান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে রানওয়ে সম্প্রসারণ করে ৭২ আসনের এটিআর বিমান চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
বালুরঘাটে বিমান পরিষেবা চালু হলে দক্ষিণ দিনাজপুরের সঙ্গে কলকাতা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরের যোগাযোগ অনেকটাই দ্রুত হতে পারে। বর্তমানে সড়ক ও রেলপথের উপর নির্ভরশীল এই অঞ্চলের ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং প্রশাসনিক যোগাযোগে বিমান পরিষেবা নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে বড় বিমান চালানোর জন্য রানওয়ে সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, টার্মিনাল পরিকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
## হাসিমারা ও কালাইরভায় চ্যালেঞ্জ
আলিপুরদুয়ারের হাসিমারা এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের কালাইরভায় প্রস্তাবিত বিমানবন্দর তৈরির ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই দুই জায়গাই ভারতীয় বায়ুসেনার গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটির সঙ্গে যুক্ত। ফলে এখানে অসামরিক বিমান পরিষেবা চালু করতে হলে নিরাপত্তা, বিমান চলাচলের সময়সূচি এবং সামরিক ব্যবহারের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখতে হবে।
হাসিমারায় সিভিল এনক্লেভ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ডুয়ার্স ও উত্তরবঙ্গের পর্যটন শিল্প উপকৃত হতে পারে। জয়ন্তী, জলদাপাড়া, বক্সা, আলিপুরদুয়ার এবং আশপাশের পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াত আরও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, কালাইরভায় বিমান পরিষেবা চালু হলে পশ্চিম মেদিনীপুর ও জঙ্গলমহল অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় সুবিধা হতে পারে। তবে বায়ুসেনার ঘাঁটির সঙ্গে সমন্বয় রেখে অসামরিক বিমানবন্দর পরিচালনা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিষয়।
## শিল্প ও পর্যটনে সম্ভাব্য প্রভাব
নতুন বিমানবন্দরগুলির অন্যতম লক্ষ্য হল রাজ্যে শিল্প বিনিয়োগ এবং পর্যটন বাড়ানো। পুরুলিয়া, জঙ্গলমহল, ডুয়ার্স এবং দক্ষিণ দিনাজপুর—এই অঞ্চলগুলিতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থান এবং শিল্প সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু অনেক জায়গায় দ্রুত যোগাযোগের অভাব রয়েছে।
বিমান পরিষেবা চালু হলে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, পর্যটক এবং প্রশাসনিক আধিকারিকদের যাতায়াত সহজ হতে পারে। শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়তে পারে। স্থানীয় ব্যবসা, হোটেল, পরিবহণ, পর্যটন পরিষেবা এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বিমানবন্দর তৈরি হলেই সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যিক বিমান পরিষেবা শুরু হবে না। যাত্রীসংখ্যা, বিমান সংস্থার আগ্রহ, বিমানবন্দরের পরিচালন ব্যয় এবং রুটের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার উপর পরিষেবা নির্ভর করবে।
সব মিলিয়ে, ২৩ সেপ্টেম্বর নবান্নে প্রস্তাবিত ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণে নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। ছররা, গালুরঘাট, হাসিমারা এবং কালাইরভায় বিমান পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়বে। এখন দেখার, চুক্তির পর নির্মাণকাজ কত দ্রুত এগোয় এবং কবে থেকে সাধারণ যাত্রীদের জন্য বিমান পরিষেবা চালু করা সম্ভব হয়।


