দক্ষিণ দিনাজপুরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় বদলের ইঙ্গিত। এক বছরের মধ্যেই বালুরঘাট বিমানবন্দর চালু করা হবে বলে ঘোষণা করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার দক্ষিণ দিনাজপুর সফরে গিয়ে প্রস্তাবিত বিমানবন্দরের জমি পরিদর্শন করেন তিনি। একইসঙ্গে জেলার জন্য আরও একাধিক বড় প্রকল্পের ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিমান পরিষেবার অপেক্ষায় থাকা বালুরঘাটবাসীর মধ্যে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় জানা গিয়েছে, বালুরঘাট বিমানবন্দর চালুর ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ে অপেক্ষাকৃত ছোট বিমান ব্যবহার করা হবে। **১৯ আসনের বিমান** দিয়ে পরিষেবা শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে যাত্রীসংখ্যা এবং পরিকাঠামোর সক্ষমতা অনুযায়ী **৭২ আসনের বিমান** চালু করা হবে। অর্থাৎ একেবারে বড় বিমান দিয়ে শুরু না করে ধাপে ধাপে পরিষেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বালুরঘাট বিমানবন্দর নতুন করে চালুর উদ্যোগ অবশ্য একেবারে সাম্প্রতিক নয়। এর আগে বিমানবন্দরটির পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং বিমান পরিষেবা চালুর বিষয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে রাজ্য সরকার জানিয়েছিল, কেন্দ্রের **UDAN (Ude Desh ka Aam Nagrik)** প্রকল্পের আওতায় বালুরঘাট, মালদহ ও পুরুলিয়া বিমানবন্দরকে উন্নত করে ফের কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করে বিমানবন্দরগুলিকে বাণিজ্যিক পরিষেবার উপযোগী করে তোলা।
বালুরঘাট বিমানবন্দরের ক্ষেত্রে মূল পরিকাঠামোর একটি অংশ ইতিমধ্যেই রয়েছে। তবে বাণিজ্যিক বিমান পরিষেবা শুরু করতে রানওয়ে, টার্মিনাল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার উন্নয়ন দরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে ছোট বিমান চালুর পরিকল্পনা সেই পরিকাঠামোগত বাস্তবতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। পরবর্তীতে পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী হলে বড় বিমানের পরিষেবা চালু করার সুযোগ তৈরি হবে।
### শুধু বিমানবন্দর নয়, মেডিক্যাল কলেজও
বালুরঘাট সফরে মুখ্যমন্ত্রী শুধু বিমানবন্দর নিয়েই ঘোষণা করেননি। দক্ষিণ দিনাজপুরের স্বাস্থ্য ও উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রেও একাধিক প্রকল্পের কথা জানিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে অন্যতম বালুরঘাটে প্রস্তাবিত **মেডিক্যাল কলেজ**। প্রায় **৩৪৪ কোটি টাকা** ব্যয়ে মেডিক্যাল কলেজ তৈরির পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। প্রকল্পের জন্য দ্রুত **১০০ কোটি টাকা** বরাদ্দ করা হবে বলেও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি কালীপুজোর আগেই প্রকল্পের ভূমিপুজো করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
মেডিক্যাল কলেজ তৈরি হলে দক্ষিণ দিনাজপুরের স্বাস্থ্য পরিষেবায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলার বহু মানুষকে অন্য শহর বা জেলায় যেতে হয়। স্থানীয়ভাবে মেডিক্যাল কলেজ তৈরি হলে চিকিৎসা পরিষেবার পাশাপাশি চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগও বাড়বে। একইসঙ্গে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে।
### বিশ্ববিদ্যালয়ে বাড়ছে পড়াশোনার সুযোগ
শিক্ষাক্ষেত্রেও বড় ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বালুরঘাটে বর্তমানে মাত্র তিনটি বিষয় নিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয় চলছে বলে তিনি জানান। সেখানে আরও চারটি বিষয় যুক্ত করে মোট **সাতটি বিষয়ে পড়াশোনার অনুমোদন** দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। জন্মাষ্টমীর আগেই এই অনুমোদন দেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
ফলে জেলার ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার জন্য অন্যত্র যাওয়ার প্রয়োজন কিছুটা কমতে পারে। স্থানীয়ভাবে বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনার সুযোগ বাড়লে দক্ষিণ দিনাজপুরের শিক্ষাক্ষেত্রেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
### রাস্তা মেরামত থেকে নতুন ফায়ার স্টেশন
বালুরঘাটের পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একাধিক ঘোষণা সামনে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, **১০ অক্টোবরের মধ্যে বালুরঘাটের সমস্ত রাস্তা মেরামতের** লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। শহর ও সংলগ্ন এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এর পাশাপাশি এলাকায় একটি **নতুন ফায়ার স্টেশন** তৈরির কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ পরিকাঠামো শক্তিশালী হলে শহর ও আশপাশের এলাকায় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়বে।
একইসঙ্গে স্থানীয় একটি নার্সিং স্কুলকে **নার্সিং কলেজে উন্নীত** করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ফলে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর পাশাপাশি নার্সিং শিক্ষার ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
### যোগাযোগ ব্যবস্থায় বদলের অপেক্ষা
বালুরঘাট বিমানবন্দর চালু হলে দক্ষিণ দিনাজপুরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে কলকাতা বা রাজ্যের অন্যান্য প্রান্তে যেতে জেলার বাসিন্দাদের মূলত সড়ক ও রেলপথের উপর নির্ভর করতে হয়। বিমান পরিষেবা চালু হলে কলকাতা-সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে।
শুধু যাত্রী পরিষেবা নয়, বিমান যোগাযোগ চালু হলে ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, চিকিৎসা এবং শিক্ষা—সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে জেলার ব্যবসায়ী ও পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্তদের জন্য দ্রুত যাতায়াতের নতুন দরজা খুলে যেতে পারে।
তবে ঘোষণার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিমানবন্দর চালু করতে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোগত কাজ কত দ্রুত শেষ হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক বছরের মধ্যে ১৯ আসনের বিমান দিয়ে পরিষেবা শুরু এবং পরে ৭২ আসনের বিমান চালুর পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা দ্রুত কার্যকর হয়, সেদিকেই নজর থাকবে দক্ষিণ দিনাজপুরবাসীর।


